Sri Hit Sevak Vani

Sri Hit Sevak Vani

The collection of couplets (dohas) and lyrical verses (ras pads) composed by Shri Hit Sevak Ji, a disciple of Shri Hit Harivansh Mahaprabhu, is known as “Sevak Vani” or “Hit Sevak Vani.”

শ্রী হিত সেবক বাণী

শ্রী হিত সেবক বাণী

১. শ্রীহিত যস বিলাস



শ্রীহরিবংশ-চন্দ্র শুভ নাম । সব সুখ সিন্ধু প্রেম রস ধাম ।
জাম-ঘটী বিসরৈ নহীং ॥
যহ জু পর্যৌ মোহি সহজ সুভাব। শ্রীহরিবংশ নাম রস চাব ।
নাব সুদৃঢ় ভব তরন কৌং ॥
নাম রটত আঈ সব সোহি। দেহু সুবুদ্ধি কৃপা করি মোহি।
পোহি সুগুন মালা রচৌং ॥
নিত্য সুকংঠ জু পহিরৌং তাস। যস বরণৌং হরিবংশ বিলাস ।
শ্রীহরিবংশহি গাই হৌং ॥১॥
Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - শ্রী হরিবংশচন্দ্র জূ-এর মঙ্গলময় নাম সমস্ত সুখের সিন্ধু এবং প্রেমরসের ধাম তথা আশ্রয়। এই নাম এক মুহূর্তের জন্যও আমার স্মৃতি থেকে বিলীন হয় না। শ্রী হরিবংশ নামের রসের প্রতি আমার মনে সহজভাবেই চাও জেগে উঠেছে, কারণ আমি ভালোভাবে বুঝেছি যে এই নাম ভবসাগর পার হওয়ার জন্য এক দৃঢ় নৌকার সদৃশ। এই নামের জপ করার ফলে এর অন্তর্নিহিত সমগ্র শোভা (প্রেম-সৌন্দর্য) আমার হৃদয়ে প্রকাশিত হয়েছে। আমাকে দয়া করে শুভবুদ্ধি দিন, যাতে আমি আপনার সুন্দর গুণগণের মালা গেঁথে সদা তা কণ্ঠে ধারণ করতে পারি। সেবক জী বলেন যে, আমি আমার বাণীতে শ্রী হরিবংশের প্রেম-বৈভবের সৌন্দর্য-বিলাসের যশ বর্ণনা করব এবং কেবলমাত্র শ্রী হরিবংশকেই গাইব।
শ্রীবৃন্দাবন বৈভব জিতী। বরনত বুদ্ধি প্রমানৌ কিতী ।
তিতী সবৈ হরিবংশ কী ॥
সখী-সখা ক্যৌং কহৌং নিবের। তৌ মেরে মন কী অবসের ।
টেরি সকল প্রভুতা কহৌং ॥
হরি-হরিবংশ ভেদ নহিং হোই। প্রভু ঈশ্বর জানেঁ সব কোই ।
দোই কহে ন অনন্যতা ॥
বিশ্বম্ভর সব জগ আভাস। যস বরনৌং শ্রীহরিবংশ বিলাস ।
শ্রীহরিবংশহি গাই হৌং ॥২॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - শ্রী বৃন্দাবন-সংক্রান্ত রসলীলা-বৈভব এতই বিশাল যে আমার বুদ্ধি তার সম্পূর্ণ বর্ণনা করতে অক্ষম; তবে এই সমস্ত বৈভব আসলে শ্রী হরিবংশেরই। ব্রজলীলা-সংক্রান্ত সখাগণ এবং নিকুঞ্জলীলা-সংক্রান্ত সখীগণকে আলাদা আলাদা বলা আমার মনের সঙ্কীর্ণতাই প্রকাশ করবে, কারণ এরা উভয়েই (সখী ও সখা) শ্রী হরিবংশেরই প্রভুত্বের অঙ্গ। প্রকৃতপক্ষে শ্রীহরি ও শ্রীহরিবংশে যেমন কোনো ভেদ নেই, তেমনি ‘প্রভু’ ও ‘ঈশ্বর’-এও কোনো ভেদ নেই। দুটি বললে তত্ত্বের অনন্যতা (একত্ব) নষ্ট হয়। যেমন ‘বিশ্বম্ভর’ (যিনি বিশ্বকে পালন করেন) এবং ‘জগ আভাসিত’ (যিনি সমগ্র জগৎকে আলোকিত করেন) — এরা এক। (তদ্রূপ শ্রীহরি ও শ্রীহরিবংশও এক।) অতএব (তত্ত্বকে অভিন্ন জেনে) আমি শ্রী হরিবংশের সৌন্দর্যেরই যশ বর্ণনা করছি এবং শ্রী হরিবংশকেই গাইব

জন্ম-কর্ম গুণ রূপ অপার। বাঢ়ৈ কথা কহত বিস্তার ।
বার-বার সুমিরন করৌং ॥
হৌং লঘু মতি জু অন্ত নহিং লহৌং। বুদ্ধি প্রমান কছূ কথি কহৌং ।
রহৌং শরণ হরিবংশ কী ॥
সোধৌং কহি মোহি কেতিক মতী। যস বরনত হারৈ সরস্বতী।
তিতী সবৈ হরিবংশ কী ॥
দেহু কৃপা করি বুদ্ধি প্রকাশ। যস বরনৌং শ্রীহরিবংশ বিলাস ।
শ্রীহরিবংশহি গাই হৌং ॥৩॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - শ্রী হরিবংশের জন্ম, কর্ম, গুণ এবং রূপ অপরিমেয়। এগুলো বিস্তারসহ বলতে গেলে কাহিনী অতি দীর্ঘ হয়ে যাবে, তাই আমি এই জন্ম, কর্মাদি কেবলমাত্র স্মরণ করেই সন্তুষ্ট থাকি। আমি লঘুমতি (স্বল্পবুদ্ধিসম্পন্ন), তাই এগুলোর শেষ প্রান্তে পৌঁছাতে পারি না। এই কারণে আমি শ্রী হরিবংশের অনন্য শরণ গ্রহণ করে, বুদ্ধি ও সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু বলার চেষ্টা করি। কিন্তু আবার ভাবি—আসলে আমার মধ্যে কতটুকুই বা বুদ্ধি আছে! কারণ শ্রী হরিবংশের যশ এতই বিশাল যে, তার বর্ণনা করতে গেলে বাণীর অধিষ্ঠাত্রী দেবী সরস্বতীও পরাজিত হবেন। এইজন্য আমি শ্রী হরিবংশের নিকট প্রার্থনা করি যে, তিনি যেন আমার বুদ্ধিতে আলোক প্রক্ষেপণ করেন, যাতে আমি তাঁর যশবিলাস বর্ণনা করতে পারি, কারণ আমি তো কেবলমাত্র শ্রী হরিবংশেরই গান করতে চাই।
কলিযুগ কঠিন বেদ বিধি রহী। ধর্ম কহূং নহিং দীখত সহী ।
কহী ভালী কৌউ না করৈ ॥
উদবস বিশ্ব ভযও সব দেশ । ধর্ম-রহিত মেদিনী-নরেস ।
ম্লেচ্ছ সকল পহুমী বঢ়ে ॥
সব জন করহিং আধুনিক ধর্ম। বেদ বিহিত জানৈং নহিং কর্ম ।
মর্ম ভক্তি কৌ ক্যৌং লহৈ।
বূড়ত ভব আভৈ ন উসাস। যস বরনৌং হরিবংশ বিলাস।
শ্রীহরিবংশহি গাই হৌং ॥৪॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - এবার অবতারের উদ্দেশ্য বলেতে গিয়ে বলেন যে, এই কলিযুগে বেদের কেবল কর্মকাণ্ডময় বিধিই অবশিষ্ট রইল, যার ফলে কোথাও ধর্ম তার শুদ্ধ রূপে প্রকাশিত হচ্ছিল না। আর সঠিক কথা বললেও কেউ তা মানতে প্রস্তুত ছিল না। সারা বিশ্বের সকল দেশ বিপথগামী অর্থাৎ উল্টোপথে চলতে লাগল এবং রাজাগণ ধর্মশূন্য হয়ে গেলেন। সমগ্র জগতে ম্লেচ্ছ ছড়িয়ে পড়ল। সকলে আধুনিক ধর্মে আসক্ত হতে লাগল। (আধুনিক ধর্ম বলতে সেই সব সম্প্রদায়কে বোঝানো হয়েছে যাদের মধ্যে নানা প্রকার ভ্রমের প্রাধান্য থাকে এবং যারা ক্রূর দেবতার উপাসনা করে ও তাঁদের সন্তুষ্টির জন্য পশুবলি দেয়।) বেদসম্মত কর্মসমূহের জ্ঞান তাঁদের আর অবশিষ্ট ছিল না। এমন লোকেরা ভক্তির মর্ম কেমন করে বুঝবে? এরা ভবসাগরে ডুবতে-ভাসতে থাকে এবং সুখের নিঃশ্বাসও নিতে পারে না। (এমন লোকদের রক্ষার জন্যই) আমি শ্রী হরিবংশের যশবিলাসের বর্ণনা করছি এবং শ্রী হরিবংশেরই গান গাইব।
ধর্ম-রহিত জানী সব দুনী। ম্লেচ্ছন ভার দুখিত মেদিনী।
ধনী অর দূজৌ নহীং ॥
করী কৃপা মন কিয়ৌ বিচার । শ্রুতিপথ বিমুখ দুখিত সংসার ।
সার বেদ-বিধি উদ্ধরী ॥
সব অবতার ভক্তি বিস্তরী। পুনি রস রীতি জগত উদ্ধরী।
কর্যো ধর্ম অপনৌ প্রগট ॥
প্রগটে জানি ধর্ম কৌ নাস। যস বরনৌং হরিবংশ বিলাস।
শ্রীহরিবংশহি গাই হৌং ॥৫॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা – ইহা দেখে যে সমগ্র সংসার ধর্মশূন্য হইয়া গিয়াছে এবং পৃথিবী ম্লেচ্ছের ভারে দুঃখভারে নত হইতেছে এবং এই সংসারের রচয়িতা প্রভুর অতিরিক্ত আর কেহই তাহার রক্ষক নহে — শ্রী হরিবংশচন্দ্র জূ-এর মনে করুণার সঞ্চার হইল। চিন্তাশীল হইয়া তিনি বুঝিলেন যে, এই সংসার বেদমার্গ হইতে বিমুখ হইয়াই দুঃখিত হইতেছে। অতএব তিনি বেদের সারবিধি “ভক্তি”-র উদ্‌ধার করিলেন। তিনি সকল অবতারের ভক্তির প্রচার করিয়া পুনরায় সংসারে রসরীতির উদ্‌ধার করিলেন এবং নিজ ধর্ম প্রকাশ করিলেন। যে শ্রী হরিবংশ ধর্মের নাশ দেখে প্রকাশিত হইয়াছিলেন, আমি সেই শ্রী হরিবংশের যশবিলাসের বর্ণনা করিতেছি এবং শ্রী হরিবংশকেই গাইব।
মথুরা মণ্ডল ভূমি আপনী। যহাঁ ‘বাদ’ প্রগটে জগ ধনী।
ভনী অবনি বর আপ মুখ ॥
শুভ বাসর শুভ ঋক্ষ বিচারি। মাধব মাস গ্যাস উজিয়ার।
নারিনু মঙ্গল গাইয়ৌ ॥
তচ্ছিন দেব-দুন্দুভী বাজিয়ে। জৈ-জৈ শব্দ সুরন মিলি কিয়ে।
হিয়ে সিরানে সবনি কে ॥
তারা জননি জনক ঋষি ব্যাস । যস বরনৌং হরিবংশ বিলাস।
শ্রীহরিবংশহি গাই হৌং॥৬॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - সম্পূর্ণ মথুরা মণ্ডল স্বীয় অর্থাৎ ভক্তিভাবময় ভূমি। তাহার অন্তর্গত ‘বাদ’ নামক গ্রামে জগতের রক্ষক প্রকট হইলেন এবং স্বশ্রীমুখ হইতে এই ব্রজভূমির বর্ণনা করিলেন। ঋতুগণের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বসন্ত ঋতুতে, বৈশাখ মাসের শুক্লা একাদশীতে, শুভ দিন ও শুভ নক্ষত্র বিবেচনা করিয়া, শ্রী হরিবংশের প্রাকট্যের সময় নারীগণ মঙ্গলগান আরম্ভ করিলেন। সেই সময় দেবগণ আকাশে দুন্‌দুভি বাজাইলেন এবং সমস্ত দেবতাগণ মিলিয়া “জয় হউক, জয় হউক” উচ্চারণ করিলেন ও সকলের হৃদয় শীতল হইল। যাঁহাদের জননী হইলেন তারারাণী এবং পিতা হইলেন ব্যাসঋষি— সেই শ্রী হরিবংশের যশবিলাসের বর্ণনা আমি করিতেছি এবং তাঁহারই গান গাইব।
শ্রীভাগবত জু শুক উচ্চরী। তৈসী বিধি জু ব্যাস বিস্তরী।
করী নন্দ জৈসী হুতী॥
ঘর-ঘর তোরন বন্দনবার । ঘর-ঘর প্রতি চিত্রহিং দরবার।
ঘর-ঘর পঞ্চ শব্দ বাজিয়ে॥
ঘর-ঘর দান প্রতিগ্রহ হোই। ঘর-ঘর প্রতি নির্তত সব কোই ।
ঘর-ঘর মঙ্গল গাবহীং॥
ঘর-ঘর প্রতি অতি হোত হুলাস। যস বরনৌং শ্রীহরিবংশ বিলাস।
শ্রীহরিবংশহি গাই হৌং ॥৭॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - শ্রীমদ্ভাগবতে শুক মুনিঁয়ে শ্রীকৃষ্ণ জন্মোৎসবের যেরূপ বর্ণন করিয়াছেন এবং নন্দরায়ে আপনে পুত্রের জন্মকালে যেরূপ বিধি অনুসারে জন্মোৎসব করিয়াছিলেন, ব্যাস মিশ্রে আপনে পুত্রের জন্মকালে সেই একই বিধি অনুসারে জন্মোৎসব করিলেন। গ্রামের প্রত্যেক গৃহদ্বারে বন্দনমাল বাঁধা হইল এবং প্রত্যেক গৃহে দরবার অর্থাৎ হাতি, ঘোড়া, বেল, বুঁটা, পুরুষ, নারি ইত্যাদির চিত্রাঙ্কন হইল। প্রত্যেক গৃহে পঞ্চশব্দ বাজিতে লাগিল (তৎ, বিতত, ঘন, সুখির, মুখ — এই পঞ্চশব্দ নামে পরিচিত)। ঘরেঘরে দান ও উপহার গ্রহণ হইতে লাগিল, প্রত্যেক গৃহের সকলে নৃত্য করিতে লাগিল, প্রত্যেক গৃহে মঙ্গলগান হইতে লাগিল। প্রত্যেক গৃহে অতিশয় উল্লাস ছড়াইয়া পড়িল। (যাঁহাদের প্রাকট্যের এমন আশ্চর্য প্রভাব প্রকাশ পাইল, সেই) শ্রী হরিবংশের যশবিলাসের বর্ণনা আমি করিতেছি এবং শ্রী হরিবংশকেই গাইব।
নির্জল সজল সরোবর ভয়ে । উখটে বৃক্ষন পল্লব নয়ে॥
দয়ে সকল সুখ সবনি কৌং ॥
অসন শয়ন সুখ নিত-নিত নয়ে। অন্ন সুকাল চহূং দিশি ভয়ে।
গয়ে অশুভ সব বিশ্ব কে ॥
ম্লেচ্ছ সকল হরি যস বিস্তরহিং।পরম ললিত বানী উচ্চরহিং।
করহিং প্রজা পালন সবৈ॥
অপনী-অপনী রুচি বস বাস। যস বরনৌং হরিবংশ বিলাস ।
শ্রীহরিবংশহি গাই হৌং ॥৮॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - শুকাইয়া থাকা সরোবর পূর্ণজলময় হইল এবং শুকাইয়া থাকা বৃক্ষসমূহে নবীন পল্লব উদ্‌গত হইল। এইভাবে শ্রী হরিবংশের প্রাকট্যে সকলেই সুখলাভ করিল। সকলের ভোজন ও শয়নে নিত্য নবীন সুখ প্রাপ্ত হইতে লাগিল। চতুর্দিকে ধানের বৃদ্ধি হইতে লাগিল এবং এইভাবে বিশ্বে সমস্ত অশুভ নাশ হইল। সমস্ত ম্লেচ্ছগণ শ্রী হরিবংশের যশের বিস্তার করিতে লাগিল, অত্যন্ত সুন্দর বাণী উচ্চারণ করিতে লাগিল এবং প্রজাপালন করিতে লাগিল। সকলেই আপন-আপন রুচি অনুসারে, যাহা যাহা ভালো লাগিল, নির্ভয়ে বাস করিতে লাগিল। (যাঁহার প্রাকট্যে এমন আশ্চর্য প্রভাব প্রকাশিত হইল, সেই) শ্রী হরিবংশের যশবিলাসের বর্ণনা আমি করিতেছি এবং শ্রী হরিবংশকেই গাইব।
চলহিং সকল জন অপনে ধর্ম । ব্রাহ্মণ সকল করহিং ষট্ কর্ম।
ভর্ম সবনি কৌ ভাজিয়ৌ ॥
ছূটি গঈ কলিযুগ কী রীতি । নিত নিত নব-নব হোত সমীতি।
প্রীতি পরস্পর অতি বঢ়ী ॥
প্রগট হোত ঐসী বিধি ভঈ । সব ভবজনিত আপদা গঈ।
নঈ-নঈ রুচি অতি বঢ়ী ॥
সব জন করহিং ধর্ম অভ্যাস । যস বরনৌং হরিবংশ বিলাস।
শ্রীহরিবংশহি গাই হৌং ॥৯॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - সব লোক আপন আপন ধর্মের পালন করিতে লাগিল, সকল ব্রাহ্মণ ষট্‌কর্ম করিতে লাগিলেন এবং সকলের ভ্রম নষ্ট হইল। শ্রী হরিবংশের প্রাকট্যের পূর্বে লোকদের উপরে কলিযুগের যেই প্রভাব পড়িয়াছিল, তাহা বিনষ্ট হইল এবং সকলের হৃদয়ে নিত্য নবীন স্নেহ উৎপন্ন হইবার ফলে পরস্পরের মধ্যে অতিশয় প্রীতি বৃদ্ধি পাইলো। শ্রী হরিবংশের প্রাকট্য হইতেই এই অবস্থার উদ্‌গম হইল এবং জন্ম-মৃত্যুজনিত সমস্ত ক্লেশ বিলুপ্ত হইল, সকলের হৃদয়ে নিত্য নবীন রুচি অতিশয় বৃদ্ধি পাইলো। তখন লোকেরা ধর্মের অভ্যাস করিতে লাগিল। (যাঁহাদের প্রাকট্যের এমন আশ্চর্য প্রভাব প্রকাশিত হইল, সেই) শ্রী হরিবংশের যশবিলাসের বর্ণনা আমি করিতেছি এবং শ্রী হরিবংশকেই গাইব।
বাল বিনোদ ন বরনত বনহিং । অপনৌং সৌ উপদেশত মনহিং ।
গনহিং কবন লীলা জিতী ॥
সব হরি-সম গুণ-রূপ অপার । মহাপুরুষ প্রগটে সংসার।
মার বিমোহন তন ধর্যৌ ॥
ছিন ন তৃপিত শুভ দর্শন আস। দুলরাবত বোলত মৃদু হাস ।
ব্যাসমিশ্র কৌ লাড়িলৌ ॥
মুদিত সকল নহীং ছাঁড়ত পাস। যস বরনৌং হরিবংশ বিলাস ।
শ্রীহরিবংশহি গাই হৌং ॥১০॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - শ্রী হরিবংশের বাল-বিনোদসমূহের বর্ণনা আমার দ্বারা হইতেছে না। আমি আমার সামর্থ্য অনুযায়ী মনে অনেক চিন্তা করি, তথাপি শ্রী হরিবংশ জূ বাল্যকালে যতো লীলা করিয়াছেন, তাহার গণনা করা যায় না। কারণ শ্রী হরিবংশ জূ-এর গুণ ও রূপ, শ্রীহরির গুণ-রূপের ন্যায়ই অপরিমেয়। মনোমোহন কামদেবকেও মোহিত করিবার উপযোগী অতিশয় সুন্দর শরীর ধারণ করিয়া এই মহাপুরুষ সংসারে প্রাকট হইয়াছেন। তাঁহার শুভদর্শনে এক ক্ষণের জন্যও তৃপ্তি লাভ হয় না এবং সকলেই ব্যাস মিশ্রের এই লাড়িলে-কে আদর করেন। আর যখন কেহ তাঁহাদের প্রতি স্নেহপূর্ণ কথা বলেন, তখন সেই (শিশুরূপ শ্রী হরিবংশ) মন্দহাস করেন। ইহাতে সকলই আনন্দিত হইয়া কেহ তাঁহাদের নিকট হইতে দূরে সরিতে চান না। (যাঁহাদের প্রাকট্যে প্রেমের এমন আশ্চর্য বৃদ্ধি ঘটিল, সেই) শ্রী হরিবংশের যশবিলাসের বর্ণনা আমি করিতেছি এবং শ্রী হরিবংশকেই গাইব।
অব উপদেশ ভক্তি কৌ কহ্যৌ । জৈসী বিধি জাকে চিত রহ্যৌ ।
লহ্যৌ জু মন বাঁছিত সফল ॥
সব হরিভক্তি কহী সমুঝাই । জৈসী-জৈসী জাহি সুহাই ।
আই সকল চরণন ভজে ॥
সাধন সকল কহে অবিরুদ্ধ। বেদ-পুরান সু আগম শুদ্ধ ।
বুধি বিবেক জে জানহীং ॥
সমুঝ্যৌ সবন সু ভক্তি উজাস । যস বরনৌং হরিবংশ বিলাস।
শ্রীহরিবংশহি গাই হৌং ॥১১॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - এবার (কিছু বড়ো হইবার পর) শ্রী হরিবংশ জূ যাহার চিত্তে যেরূপে স্থিত হইতে পারেন, সেই রূপে তিনি ভক্তির উপদেশ আরম্ভ করিলেন। ইহাতে সকল লোক মনোবাসনা-সিদ্ধির অভিজ্ঞতা লাভ করিল। যাহার নিকট যেরূপ ভক্তি রুচিকর বলিয়া প্রতীয়মান হইল, তিনি তাহাকে সেই রূপেই বুঝাইয়া বলিলেন। ইহাতে সকলেই তাঁহার চরণভজন করিতে লাগিল। তিনি বেদ, পুরাণ ও আগমতন্ত্রে বর্ণিত ভক্তির দান, জপ, স্বাধ্যায়, সংযম প্রভৃতি সাধনসমূহকে পরস্পর অবিরুদ্ধ বলিয়া প্রতিপন্ন করিলেন (অর্থাৎ ইহাদের মধ্যে কোনো বিরোধ নাই, ইহা প্রকাশ করিলেন)। যাঁহাদের মধ্যে সার-অসার বিবেকবুদ্ধি রহিয়াছে, তাহারা ইহা বুঝিতে পারিল। এই সমস্ত দ্বারা সকলেই ভক্তির প্রকাশ উপলব্ধি করিল। সেই শ্রী হরিবংশের যশবিলাসের বর্ণনা আমি করিতেছি এবং শ্রী হরিবংশকেই গাইব।
অব অবতার ভেদ তিন কহে। সকল উপাসক তিন মন রহে॥
কহে ভক্তি সাধন সবৈ ॥
মথুরা নিত্য কৃষ্ণ কৌ বাস । নিশি-দিন শ্যাম ন ছাঁড়ত পাস।
তাসু সকল লীলা কহী ॥
কহী সবনি কী একৈ রীতি । শ্রবন-কথন সুমিরন পরতীতি।
বীতি কাল সব জাইয়ৌ ॥
উপজ্যৌ সবনি সুদৃঢ় বিশ্বাস। যস বরনৌং হরিবংশ বিলाস।
শ্রীহরিবংশহি গাই হৌং ॥১২॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - এর পর শ্রী হরিবংশচন্দ্র জূ শ্রী রাম, শ্রীকৃষ্ণ, নৃসিংহ, বামন প্রভৃতি অবতারসমূহের বর্ণনা করিলেন। এই সকল অবতারের উপাসকগণের জন্য তাঁহার মনে স্থান রহিয়াছিল। এর সহিত তিনি সমগ্র ভক্তিসাধনসমূহেরও বর্ণনা করিলেন। যে শ্রীকৃষ্ণ মথুরায় নিত্য বিরাজমান এবং যিনি কভু তাহা হইতে বিচ্ছিন্ন হন না, তাঁহার সমগ্র লীলাসমূহ তিনি কহিলেন। তিনি সকল ভক্তকে একটিমাত্র রীতি বুঝাইলেন এবং তাহা হইল — শ্রবণ, কীর্তন ও স্মরণে দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করা। শ্রী হরিবংশচন্দ্র জূ-এর সমগ্র সময় এই উপদেশসমূহেই অতিবাহিত হইত। এই উপদেশসমূহ হইতে সকলের মনে ভক্তিমার্গের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাসের উদ্‌গম হইল। এমন শ্রী হরিবংশের যশবিলাসের বর্ণনা আমি করিতেছি এবং শ্রী হরিবংশকেই গাইব।
অব জু কহী সব ব্রজ কী রীতি । জৈসী সবন নন্দ-সুত প্রীতি।
কীর্তি সকল জগ বিস্তরী ॥
বাল চরিত্র প্রেম কী নীংব । কহত- সুনত সব সুখ কী সীংব ।
জীবন ব্রজ-বাসিনু সফল ॥
ব্রজ কী রীতি সু অগম অপার । বিস্তরি কহী সকল সংসার ।
কারজ সবহিনু কে ভয়ে ॥
ব্রজ কী প্রীতি-রীতি অনিয়াস। যস বরনৌং হরিবংশ বিলাস।
শ্রীহরিবংশহि গাই হৌং ॥১৩॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - মথুরা-লীলা সমাপ্ত করিয়া তিনি ব্রজের রীতি কহিলেন এবং সকল ব্রজবাসীর নন্দনন্দনে যেরূপ প্রীতি ছিল, তাহার বর্ণনা করিলেন। ইহাতে শ্রী হরিবংশচন্দ্র জূ-এর কীর্তি সমগ্র বিশ্বে বিস্তৃত হইল। ব্রজের মূল লীলা হইল শ্রীকৃষ্ণের বাললীলা। এই লীলাতেই প্রেমের ভিত্তি স্থাপিত রহিয়াছে। (শ্রীকৃষ্ণের সমগ্র লীলাসমূহে তাঁহার বালচরিত্র হইতেই প্রেমের উদয় আরম্ভ হয়।) এই বালচরিত্রই ব্রজবাসীগণের চিত্তে পরমপ্রেম উৎপন্ন করিয়া তাহাদের জীবন সফল করিল। ব্রজের অগম্য-অপারেরীতি তিনি সমগ্র জগতে বিস্তারপূর্বক বলিলেন, যাহাতে সকল লোকের কর্ম সিদ্ধ হইল। ব্রজের প্রীতি সহজরীতি-সম্ভূত; অর্থাৎ ব্রজের প্রীতিতে কোনো প্রকারের কৃত্রিমতা বা আয়াস-প্রয়াস নাই। ইহা নন্দনন্দনের প্রতি ব্রজবাসীগণের স্বাভাবিক প্রীতি। এমন শ্রী হরিবংশের যশবিলাসের বর্ণনা আমি করিতেছি এবং শ্রী হরিবংশকেই গাইব।
জেহি বিধি সকল ভক্তি অনুসার। তৈসী বিধি সব কিয়ৌ বিচার।
সারাসার বিবেকি কৈং॥
অব নিজু ধর্ম আপনৌং কহত । তহাঁ নিত্য বৃন্দাবন রহত।
বহত প্রেম-সাগর যহাঁ ॥
সাধন সকল ভক্তি যা তনৌং । নিজু বৈভব প্রগটত আপনৌং।
ভনৌং এক রসনা কহা॥
শ্রীরাধা যুগ চরণ নিবাস। যস বরনৌং হরিবংশ বিলাস।
শ্রীহরিবংশহি গাই হৌং ॥১৪॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - শ্রী হরিবংশচন্দ্র জূ সার ও অসারের বিবেক সম্যকভাবে ভক্তিমার্গের অনুকূলে করিয়াছিলেন। সেবক জী বলেন— আমি এখন শ্রী হরিবংশচন্দ্র জূ-এর সেই বিশেষ সহজ ধর্মের বর্ণনা করিতেছি, যাহার প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁহার প্রাকট্য ঘটিয়াছিল। এই স্বীয় ধর্মে তিনি প্রেমের সেই ভুমিকার পরিচয় দিয়াছেন, যেখানে প্রেমসাগর নিত্য বহমান থাকে; অর্থাৎ যেখানে অগাধ, অপার প্রেম সদা গতিশীল এবং লীলাপরায়ণ রহে, আর যেখানে নিত্য নবীন লীলারূপী তরঙ্গ উদিত হইতে থাকে। প্রেমের এই আশ্চর্য ভূমিকাকে তিনি ‘নিত্য বৃন্দাবন’ বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। নিত্য বৃন্দাবনে প্রেম এই আশ্চর্য স্তরে সদা স্ফুরিত হইয়া থাকে। শ্রী ব্যাস জী, ধ্রুবদাস জী প্রভৃতি আদি-পর্যায়ের রসিক মহাত্মাগণ এইজন্যই শ্রী হিতাচার্য প্রবর্তিত রসরীতিকে ‘বৃন্দাবন রসরীতি’ বলিয়াছেন। এই প্রেমভূমিকা অথবা নিত্য বৃন্দাবনে পৌঁছিবার সাধন হইল সমগ্র নয় প্রকার ভক্তি, এবং এই সাধনার ফল হইল স্বীয় সহজ বৈভব বা আত্মবৈভবের প্রকাশ। অতএব সেবক জী বলেন— উপাসকের এই অবস্থার বর্ণনা আমি আমার এক জিহ্বা দ্বারা করিতে পারি না। শ্রী হরিবংশচন্দ্র জূ প্রবর্তিত এই আশ্চর্য প্রেমবৈভবের নিবাস তথা অবস্থান হইল শ্রী রাধার যুগলচরণকমল। যিনি জগতের জীবসমূহকে এই আশ্চর্য শোভাবিস্তারসাগরের পরিচয় দান করিয়াছেন, সেই শ্রী হরিবংশের যশবিলাসের বর্ণনা আমি করিতেছি এবং শ্রী হরিবংশকেই গাইব।
জৈ জৈ শ্রীহিত যস বিলাস প্রথম প্রকরণ কী জৈ জৈ শ্রীহিত হরিবংশ !

২. শ্রীহিত রস - বিলাস



শ্রীহরিবংশ নিত্য বর-কেলি। বাড়়ত সরস প্রেম-রস বেলি ॥
মেলি কণ্ঠ ভুজ খেলহीं ॥
বনিতন-গন মন অধিক সিরাত। নিরখি-নিরখি লোচন ন অঘাত
গাত গৌর-সাঁওল বনে ॥
জূথ- জূথ জুবতিনু কে ঘনে । মধ্য কিশোর-কিশোরী বনে ॥
গনৈঁ কৱন রতি অতি বাড়়ী ॥
নিত-নিত লীলা, নিত-নিত রাস। শুনহু রসিক হরিবংশ বিলাস।
শ্রীহরিবংশহি গাইহৌঁ ॥১॥
Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - শ্রী হরিবংশের শ্রেষ্ঠ নিত্য খেলায় সুধারস প্রেমের লতাপল্লব ক্রমশ প্রস্ফুটিত হয় এবং শ্রী শ্যামাশ্যাম পরস্পর কাঁধে হাত রেখে সদা ক্রীড়ায় লিপ্ত থাকেন। এই খেলার দর্শনে শ্রী শ্যামাশ্যামের দাসীরা আরও বেশি শীতলিত হয় এবং তাদের চোখ তাকে দেখে অপ্রসন্নই থাকে। শ্রী শ্যামাশ্যাম একই রসের দুটি অবয়ব, যার মধ্যে শ্রী রাধা গৌরবর্ণ এবং শ্রী শ্যাম সুন্দর সাঁওয়লা। এই খেলায় যুবতীদের (সখীদের) অনন্ত যৌবনের মাঝে নিত্য কিশোর ও কিশোরী শ্রী শ্যাম শ্যামা সুসজ্জিত থাকেন। এদের পরস্পরের রতি এতোটাই প্রবল যে তা গণনা করা যায় না। এই খেলায় নিত্য নতুন লীলা ও নিত্য নতুন রস ঘটে। শ্রী সেবকজি বলেন, হে রসিকগণ! তোমরা এই শ্রী হরিবংশের বিলাস শুনো, আমি শ্রী হরিবংশকেই গাইব।

লতা-ভবন সুখ শীতল ছহাঁ । শ্রীহরিবংশ রহত নিত জহা॥
তহাঁ ন বৈভব আন কি ॥
যব-যব হোত ধর্ম কি হানি। তব-তব তনু ধরি প্রগটত আনি ॥
জানি অর দুজৌ নহीं ॥
যো রস রীতি সবনি তেঁ দূরি । সো সব বিশ্ব রহি ভরপূরি ॥
মূরি সজীবন কহি দই ॥
সব জন মুদিত কৰত মন হাস। শুনহু রসিক হরিবংশ বিলাস
শ্রীহরিবংশহি গাই হৌঁ ॥২॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - শ্রী হরিবংশের নিত্য নিবাসস্থল শ্রী বৃন্দাবন, যা পরম সুখময়ী শীতল ছায়াযুক্ত লতাভবন, এবং সেখানে প্রেমের মহিমা ছাড়া অন্য কোনো ভগবত্ত্ব বা ঐশ্বর্যের প্রভাব প্রবেশ করে না। পৃথিবীতে যখন-যখন ধর্মের ক্ষয় ঘটে, তখন-তখন পরম প্রেমের অবতারে শ্রী হরিবংশ মনুষ্যদেহ ধারণ করে প্রকাশিত হন। তিনি জানেন, এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বের অন্য কোনো রক্ষক নেই। তিনি বিশ্বের মধ্যে প্রকাশ পেয়ে একটি মৌলিক সত্য জানান—যে রস-নীতি (প্রেমভাব) পরমাত্মা প্রেমের রূপে সবার পৌঁছার বাইরে (এবং শ্রী বৃন্দাবনের নব নিকুঞ্জে নিবাসরত) আছে, সেটাই তার বিকৃত মায়াবী রূপে সমগ্র বিশ্বে প্রচলিত। বাস্তবে আমাদের পরিচিত জাগতিক প্রেম সেই পরমাত্মা প্রেমের এক আভা দ্বারা আলোকিত এবং তার সন্ধান দেয়। এই সর্বব্যাপী প্রেমভাবকে শ্রী হরিবংশচন্দ্র জীবের জন্য সংজীবন মূড়ি (সংজীবন বাটি) বলেছেন; অর্থাৎ, এই সর্বব্যাপী প্রেমভাবের আশ্রয় নিয়ে মানবজীবনে পরম বিশ্রাম প্রাপ্তি সম্ভব এবং জীবন ধন্য করা যায়। এটি শুনে সংসারী জনের মন আনন্দিত হয়ে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। হে রসিকজন, এমন শ্রী হরিবংশচন্দ্রের বিলাসের বর্ণন শুনো, আমি শ্রী হরিবংশকেই গাইব।

ললিতাদিক শ্যামা অরু শ্যাম। শ্রীহরিবংশ প্রেম রস ধাম ॥
নাম প্রগট জগ জানিয়ে ॥
শ্রীহরিবংশ-জনিত যেখানে প্রেম। তহাঁ কহাঁ ব্রত-সংযম-নেম ॥
ছেম সকল সুখ সম্পদা ॥
তহাঁ জাতি-কুল নহিঁ বিচাৰ। কউন সু উত্তম, কউন গँবার ॥
সার ভজন হরিবংশ কৌ ॥
য়া রস মগন মিটৈ ভব-ত্রাস। শুনহু রসিক হরিবংশ বিলাস ॥
শ্রীহরিবংশহি গাই হৌঁ ॥৩॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - ললিতাদি সহচরীগণ, শ্রী রাধিকা শ্যাম সুন্দর এবং শ্রী হরিবংশের প্রেমরসের ধাম শ্রী বৃন্দাবন, যেটির নাম দ্বারা সারা বিশ্ব পরিচিত, এই চারজনই শ্রী হরিবংশ প্রেমের বিভিন্ন প্রকাশ। যেমন দুধের ফল দই, পানির ফল ওলা বা বরফ। যে হৃদয়ে শ্রী হরিবংশের সৃষ্টি প্রেম বিরাজমান থাকে, সেখানে উপবাস, নিয়ম বা সংযমের কোনও বাঁধন থাকে না; এদের প্রতি কোনো আসক্তি নেই। এই প্রেমই সম্পূর্ণ কল্যাণের মূল, অন্য কারওর দ্বারা রক্ষার প্রয়োজন নেই, এবং এটি পূর্ণ সুখ ও সম্পদরূপ। এই প্রেমে জাতি বা কুলের বিবেচনা নেই; বুদ্ধিমান এবং অজ্ঞানের মধ্যে কোনো ভেদ নেই। এতে শ্রী হরিবংশের ভজনই পরম সার্থক। এই রসে নিমগ্ন হলে সমস্ত ভবত্রাস (জীবনের ভয় ও কষ্ট) নষ্ট হয়ে যায়। হে রসিকজন, এমন ভবভয়নাশক শ্রী হরিবংশচন্দ্রের বিলাস শোনো, আমি শ্রী হরিবংশকেই গাইব।

শ্রীহরিবংশ সুজস গাইয়ো । সো রস সব রসিকনি পাইয়ৌ ॥
কিয়ৌ সুকৃত সবকৌ ফল্যৌ ॥
য়া রস মে বিধি নহিঁ নিষেধ । তহাঁ ন লগন গ্ৰহন কে বেধ ॥
তহাঁ কুদিন-দিন কছু নহিঁ ॥
নহিঁ শুভ-অশুভ, মান-অপমান। নহিঁ অনৃত-ভ্ৰম, কপট-সয়ান ॥
স্নান-ক্রিয়া, জপ-তপ নহিঁ ॥
জ্ঞান-ধ্যান তহাঁ সকল প্রচাস। শুনহু রসিক হরিবংশ বিলাস ॥
শ্রীহরিবংশহি গাই হৌঁ ॥৪॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - শ্রী হরিবংশচন্দ্রজি শ্যামাশ্যামের যে সুন্দর কীর্তি নিজের রচনায় গেয়েছেন, সেই রস সকল রসিককে প্রাপ্ত হয় এবং সকলের সুকৃত (পুণ্য) ফল প্রাপ্তি ঘটে। শ্রী হরিবংশের এই রসে শাস্ত্রনির্ধারিত নিষেধের বাঁধন নেই, এতে মেষ-বৃষ ইত্যাদি লগ্ন এবং সূর্য-চন্দ্র ইত্যাদি গ্রহের প্রভাব প্রযোজ্য নয়। এতে 'ভালো দিন' বা 'খারাপ দিন'-এর ধারণা নেই, কারণ এই রস মায়া-কালের বাইরে। এতে শুভ বা অশুভের ভাব নেই। এতে মান-সাধক বা অপমান বাধক নেই। এতে মিথ্যা, বিভ্রান্তি, কপটতা এবং চাতুর্যের জন্য কোনো স্থান নেই। এতে স্নানকর্ম বা স্নানের সময়কালের মন্ত্রোচ্চারণ নেই, এবং নীরস জপ-তপও নেই। এতে সাংখ্য-ওেদান্ত ইত্যাদির জ্ঞান এবং অষ্টাঙ্গ যোগের একটি অংশ 'ধ্যান' শুধুমাত্র প্রচেষ্টা মাত্র, যা কষ্টই সৃষ্টি করে। (কারণ এই রস ভজন-কৃপানুরাগ থেকে উৎপন্ন।) হে রসিকজন, শ্রী হরিবংশের এমন রস বিলাস শুনো, আমি শ্রী হরিবংশকেই গাইব।

যহাঁ শ্রীহরিবংশ প্রেম-উন্মাদ । তহাঁ কহাঁ স্বারথ নিস্বাদ ॥
বাদ - বিবাদ তহাঁ নহিঁ ॥
জে শ্রীহরিবংশ-নাদ মোহিয়ে। তিন ফির বহুরি ন কুল-ক্রম কিয়ে
জিয়ে কাল-বস না পরে ॥
কুল বিনু কহৌ কউন সৌ চাক । সহজ প্রেম রস সাঁচে পাক ॥
রঙ্ক - ঈশ সমুজ্ঝত নহিঁ।
বিপ্র ন শূদ্র কউন কুল কাস। শুনহু রসিক হরিবংশ বিলাস ॥
শ্রীহরিবংশহি গাই হৌঁ ॥৫॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - যেখানে শ্রী হরিবংশের সৃষ্টি প্রেমের সুধারস উন্মত্ততা বিরাজমান, সেখানে নীরস স্বার্থের কি কাজ, এবং নিজের মত প্রতিষ্ঠার জন্য বিতর্কের কি প্রয়োজন? উদাহরণস্বরূপ, যাঁরা শ্রী হরির বংশীনাদে মোহিত হয়েছেন, তাঁরা ফিরে এসে নিজের কুলকর্ম সম্পন্ন করেননি, এবং যতদিন জীবিত ছিলেন, ততদিন সময়ের বন্দিত্বে পড়েননি; তারা কেবল প্রেমাধীনে ছিলেন। সেবকজি বলেন, বলুন তো, কুমারের কোন চাকা আছে যেখানে কুল থাকে? অতএব, এই বিভ্রান্তিকর কুলকর্মের পালন ত্যাগ করে উপাসককে নিজের জীবনকে সহজ প্রেমরসের ছাঁচে গড়ে তোলা উচিত, যা একবার ছাঁচে ঢলে গেলে চাকার কুলো-সকোরের মতো আর কেবল আবে পোকা হতে হয় না। প্রেমরসের ছাঁচে ঢলে গেলে, রঙ্ক ঈশ, ব্ৰাহ্মণ-শূদ্র ইত্যাদি কুলভিত্তিক ভেদও উপাসকের দৃষ্টিতে স্বাভাবিকভাবেই নষ্ট হয়ে যায়।

য়া রস বিমুখ করত আচার। প্রেম বিনা জু সবৈ কৃত আর॥
ভার ধরত কত বিপ্র কউ ॥
শ্রীহরিবংশ কিশোর অহীর। অরু তিন সঙ্গ বনিতন কি ভীর ॥
তীর জমুন নিত খেলহিঁ ॥
তিনকি দই জু জূঠন খাত। আচারী নিজ কহত খিস্যাত ॥
বাত ইহৈ সাঁচি সদা ॥
শ্রীহরিবংশ কহত নিত জাস। শুনহু রসিক হরিবংশ বিলাস ॥
শ্রীহরিবংশহি গাই হৌঁ ॥৬॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - এই প্রেমরস থেকে যারা বিমুখ, অর্থাৎ যাদের হৃদয়ে প্রেমরস উৎপন্ন হয়নি, তাঁরা আচাৰ-ধর্মের পালনেই ব্যস্ত থাকেন। (আচার-ধর্ম মানে বর্ণাশ্রমের বিভিন্ন বাঁধন, ছোঁয়া-ছুত ইত্যাদি)। তারা বুঝতে পারে না যে যত ধর্মকর্ম আছে, তা প্রেমবিহীন ভজনে বাধা সৃষ্টি করে এবং তাকে ক্ষয় করে। এমন মানুষরা বৃথা নিজের ব্রাহ্মণপনার ভার বহন করেন। যাদের জন্য সবাই আচাৰ করে, তিনি প্রেমরূপ শ্রী হরিবংশের কিশোর-কিশোরী আথীর জাতিতে প্রকাশিত, এবং তাঁদের সঙ্গে সর্বদা নারীজনের (সখী) ভিড় থাকে এবং যমুনার তীরে সদা ক্রীড়ায় লিপ্ত থাকেন। যারা এই আথীর কুলোদ্ভূত কিশোর-কিশোরীর উচ্ছিষ্ট গ্রহণ করে (এবং সেটিকে নিজের প্রেমের প্রধান পুষ্টি মনে করে), তারা নিজেরা আচাৰবান বলার সময় লজ্জা অনুভব করে, এবং এই কথা ত্রিকালে সত্য। শ্রী হরিবংশও সর্বদা এই বিষয়ের উপর গুরুত্ব দিয়েছেন। হে রসিকজন, এমন শ্রী হরিবংশের বিলাস শুনো, আমি শ্রী হরিবংশকেই গাইব।

নিশি দিন কহত পুকারਿ-পুকারি। স্তুতি করহু দেহু কউ গারি
হার ন আপনী মানি হৌঁ ॥
শ্রীহরিবংশ চরণ নহিঁ তজৌঁ । অরু তিনকে ভজনত কউঁ ভজৌঁ ॥
লজৌঁ নহিঁ অতি নিড়র হৈ ॥
শ্রীহরিবংশ নাম বল লহৌঁ। আপনে মন ভাই সব কহৌঁ ॥
রহৌঁ শরণ হরিবংশ কি ॥
কহত ন বনত প্রেম উজ্জাস । শুনহু রসিক হরিবংশ বিলাস ॥
শ্রীহরিবংশহি গাই হৌঁ ॥৭॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - আমি রাত্রি-দিবস এই ঘোষণা উচ্চস্বরে দিতে প্রস্তুত যে কেউ আমার স্তব করুন বা আমাকে গালি দিক, আমি আমার পরাজয় স্বীকার করতে প্রস্তুত নই। আমি কোনো পরিস্থিতিতেই শ্রী হরিবংশের পাদপদ্ম আশ্রয় ত্যাগ করব না এবং শুধুমাত্র তাঁরই নয়, তাঁর ভজনকারীদেরও ভজন করতে থাকব। এতে আমি লজ্জা অনুভব করব না এবং কারওর কাছ থেকে ভয় পাব না। আমি শ্রী হরিবংশ নামে শক্তি প্রাপ্ত হয়ে আমার মনকে প্রিয় সমস্ত কথা বলব এবং কেবল শ্রী হিতজীর শরণে থাকব। শ্রী হরিবংশের শরণে থাকার ফলে আমার হৃদয়ে প্রেমের যে অনবদ্য প্রভা উদ্ভূত হয়েছে, তার বর্ণনা করতে আমি অক্ষম। হে রসিকজন, এমন শ্রী হরিবংশের বিলাস শুনো, আমি শ্রী হরিবংশকেই গাইব।

জে হরিবংশ প্রেম রস ঝিলে। কিয়োঁ সোহৈঁ লগন মেঁ মিলে।
গিল্যৌ কাল জগ দেখিয়ে ॥
কর্ম সকাম ন কবহুঁ করে। স্বর্গ ন ইচ্ছ্যাঁ, নরক ন ডরেঁ ॥
ধর্যাঁ ধর্ম হরিবংশ কউ ॥
শ্রীহরিবংশ - ধর্ম নির্বহ্যাঁ। শ্রীহরিবংশ প্রেম রস লহ্যাঁ ॥
তে সব শ্রী হরিবংশ কে ॥
‘সেবক’ তিন দাসনি কউ দাস। শুনহু রসিক হরিবংশ বিলাস ॥
শ্রীহরিবংশহি গাই হৌঁ ॥৮॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - যারা শ্রী হরিবংশের প্রেমরসে নিমগ্ন, তারা সংসারী জনদের মধ্যে মিলিত হলেও সৌন্দর্য প্রদর্শন করে না, কারণ তারা দেখে এই সংসার কালগ্রস্ত। শ্রী হরিবংশ-প্রেমের প্রবাহে থাকা প্রেমিকজনরা (রসিকজন) কখনো স্বার্থসিদ্ধি কামনা করেন না। তারা স্বর্গের লোভ এবং নরকের ভয় ত্যাগ করে শ্রী হরিবংশ ধর্মকে ধারণ করেন। এইভাবে শ্রী হরিবংশের ধর্ম পালনকারীরা শ্রী হরিবংশের প্রেমরস প্রাপ্ত হয়, এবং এভাবেই শ্রী হরিবংশ তাদের নিজস্ব মনে করেন। সেবকজি বলেন, আমি নিজেকে শ্রী হিত হরিবংশের এই দাসদের দাস মনে করি। হে রসিকজন, এমন মহিমাশালী শ্রী হরিবংশের বিলাস শুনো, আমি শ্রী হরিবংশকেই গাইব।
জৈ জৈ শ্রীহিত রস বিলাস দ্বিতীয় প্রকরণ কি জৈ জৈ শ্রীহিত হরিবংশ !

৩. শ্রীহিত নাম প্রতাপ যশ


শ্রীহরিবংশ নাম নিত কহৌঁ। নাম প্রতাপ নাম ফল লহৌঁ ॥
নাম হামারি গতি সদা ॥
জে সেবৈঁ হরিবংশ সুনাম। পাবৈঁ তিন চরণন বিশ্রাম ॥
নাম রটন সন্তত করে ॥
নাম প্রসঙ্গ কহত উপদেশ। যহঁ ইহ ধর্ম ধন্য সো দেশ ॥
ধন্য সুকুল জেহি জন্ম ভয়ৌ॥
ধন্য সু তাত ধন্য সো মাই। সন্তত সকল শুনহু চিত লাই ॥
শ্রীহরিবংশ প্রতাপ যশ ॥১॥
Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - আমি শ্রীহরিবংশের নাম নিত্য উচ্চারণ করে চলি, আর এই নামের প্রতাপেই নামফল — শ্রীবৃন্দাবনের প্রেমবৈভব — লাভ করে থাকি। অতএব লোক ও পরলোক, সর্বত্রই নামই আমার একমাত্র গতি। যারা শ্রীহরিবংশ নামের সেবা সদা করে থাকেন, তাঁরা তাঁর চরণকমলে বিশ্রাম তথা পরমশান্তি লাভ করেন এবং নামের রটনে সদা নিমগ্ন থাকেন। যে ধর্মে শ্রীহরিবংশ নামকে প্রসঙ্গ করে, অর্থাৎ শ্রীহরিবংশ নামকে অগ্রে রেখে ধর্মোপদেশ করা হয়, সেই ধর্ম যেই দেশে বিরাজমান সেই দেশ ধন্য, আর এই ধর্মকে ধারণকারী যে সুন্দর কুলে জন্ম নেয়, সেই কুল ধন্য। তাকে জন্মদানকারী তার পিতা-মাতা ধন্য। অতএব, হে রসিকজন! নিরন্তর একাগ্রচিত্তে শ্রীহরিবংশ নামের প্রতাপের এই মহিমা শোনো।

প্রথম হৃদয় শ্রদ্ধা জো করৈ। আচারজন যায় অনুসরৈ ॥
যহাঁ - যহাঁ হরিবংশ কে ॥
রসিকন কি সেবা যখন হৈ । প্রীতি সহিত বুঝহু সব কই ॥
কউন ধর্ম হরিবংশ কউ ॥
কউন সুরীতি, কউন আচরণ । কউন সুকৃত জেহি পাবৈঁ শরণ ॥
ক্যৌঁ হরিবংশ কৃপা করৈঁ ॥
তব সব ধর্ম কহ্যৌ সমুজাই । সন্তত সকল শুনহু চিত লাই ॥
শ্রীহরিবংশ প্রতাপ যশ ॥২॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - প্রথমে শ্রীহরিবংশধর্মের প্রতি হৃদয়ে দৃঢ় শ্রদ্ধা জাগ্রত হওয়া প্রয়োজন। আর সেই শ্রদ্ধা উদয় হলে যেখানে যেখানে শ্রীহরিবংশধর্মের আচার্যগণ আছেন, সেখানে গিয়ে তাঁদের অনুগত হওয়া উচিত। এই রসিকাচার্যগণকে সেবার দ্বারা প্রসন্ন করে প্রেমভরে জিজ্ঞাসা করা উচিত — শ্রীহরিবংশের ধর্ম কী? এই ধর্মে ভজনের রীতি কীরূপ? এতে কীরূপ আচরণের প্রয়োজন আছে, অর্থাৎ এই ধর্মে প্রবৃত্ত সাধককে কেমন আচরণ করা উচিত? আর সেই সকল পুণ্যকর্ম কী, যাহা সম্পাদন করিলে শ্রীহরিবংশের শরণলাভ হয় এবং শ্রীহরিবংশ প্রসন্ন হন? এইভাবে নিষ্ঠার সঙ্গে প্রশ্ন করিলে সেই রসিকাচার্যগণ শ্রীহরিবংশধর্ম সুস্পষ্টভাবে বুঝাইয়া দেবেন। অতএব হে রসিকজন! নিরন্তর একাগ্রচিত্তে শ্রীহরিবংশপ্রতাপের এই মহিমা শোন।
প্রথমহিঁ সেবহু গুরু কে চরণ । জিন ইহ ধর্ম কহ্যৌ সব করণ ॥
নাম-প্রতাপ বতাইয়ৌ ॥
যো হরিবংশ নাম অনুসরহু। নিশিদিন গুরু কউ সেবন করহু ॥
সকল সমর্পন প্ৰাণ-ধন ॥
গুরু-সেবা তজি করহিঁ জে বানি । ইহৈ অধর্ম, ইহৈ সব হানি ॥
কানি ন রসিকন মেঁ রহৈ ॥
গুরু-গোবিন্দ ন ভেদ করাই । সন্তত সকল শুনহু চিত লাই ॥
শ্রীহরিবংশ প্রতাপ যশ ॥৩॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - সর্বপ্রথম সেই গুরুদেবের শ্রীচরণ শরণ করা উচিত, যিনি শ্রীহরিবংশধর্মের সম্পূর্ণ আচরণরীতি সুস্পষ্ট করিয়া দেখাইয়াছেন এবং শ্রীহরিবংশ-নামের প্রতাপ প্রকাশ করিয়াছেন। যদি শ্রীহরিবংশ-নামের অনুগমন করার দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করা হয়, তবে আপন প্রাণ ও ধন সম্পূর্ণরূপে তাঁহাদের নিকটে সমর্পণ করিয়া দিনরাত্রি গুরুসেবনে প্রবৃত্ত হওয়া কর্তব্য। যে সকল সাধক গুরুসেবা পরিত্যাগ করিয়া অন্য সাধনসমূহ যত্নসহকারে করিতে থাকে, তাহারা এইটুকু অনুধাবন করে না যে, ইহাই প্রকৃত অধর্ম এবং ইহাতেই তাহাদের ক্ষতি নিহিত। এমন ব্যক্তিগণ রসিকজনদের মধ্যে সম্মান লাভ করে না। কারণ গুরু ও গোবিন্দে কোন প্রকার ভেদ করিতে পারে না। অতএব, হে রসিকজন! শ্রীহরিবংশ-প্রতাপের এই যশ নিরন্তর একাগ্রচিত্তে শ্রবণ কর।
গুরু উপদেশ শুনহু সব ধর্ম । শ্রীহরিবংশ-নাম ফল-মর্ম ॥
ভ্রম ভগ্যৌ বচনন শুনত ॥
শুক-মুখ-বচন জু শ্রবণ শুনাবহু। তব হরিবংশ সুনাম কহাবহু ।
মন সুমিরন বিসরৈ নহিঁ ॥
হরি-গুরু-চরণ-সেবা অনুসরহু। অর্চন-বন্ধন সন্তত করহু ॥
দাসনতন করਿ সুখ লহৌ ॥
সখ্য সমর্পন ভক্তি বাড়াই। সন্তত সকল শুনহু চিত লাই ॥
শ্রীহরিবংশ প্রতাপ যশ ॥৪॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - গুরু উপদেশের মাধ্যমে শ্রী হরিবংশের সম্পূর্ণ ধর্ম শ্রবণ করো এবং শ্রী হরিবংশ নামের ফলের মর্ম তথা রহস্য বুঝো। শ্রীগুরু-এর বচন শ্রবণ করলে সকল বিভ্রান্তি দূর হয়। সর্বপ্রথম শুকদেব জীর মুখের বচন অর্থাৎ শ্রীমদ্ভাগবত শ্রবণ করা উচিত। (শ্রীমদ্ভাগবতের শ্রবণ দ্বারা মন ভক্তির স্বরূপ ও তার আচরণ বুঝিলে) তখন জিহ্বা দ্বারা শ্রী হরিবংশ নাম উচ্চারণ করা উচিত এবং মনেই তার স্মরণ অবিরত রাখতে হবে। শ্রীমদ্ভাগবতের উপদেশানুসারে শ্রীহরি ও শ্রীগুরু-চরণ অবিরত সেবা করা উচিত, তাঁদের আর্চন ও বন্দনা সদা করতে হবে এবং তাঁদের দাসত্বের মাধ্যমে সুখলাভ করতে হবে। তাঁদের প্রতি সখ্যভাব, অর্থাৎ নিষ্কলঙ্ক বিশ্বাসসহ পরম স্নেহ ও সর্বসমর্পণ (অর্থাৎ সর্বত্র শ্রীগুরু-এর হাতে বিক্রি হয়ে যাওয়া) এই ধরনের মনোভাব থাকিলে ভক্তি বৃদ্ধি পায়। অতএব, হে রসিকজন! নিরন্তর একাগ্রচিত্তে শ্রী হরিবংশের প্রতাপের মহিমা শ্রবণ কর।
গুরু-উপদেশ চলহু এটি চাল । এসি ভক্তি করহু বহু কাল ॥
এ নব লক্ষণ ভক্তি কে ॥
এ হরি-ভক্তি করৈ জব কোই। তব হরিবংশ নাম রতি হোই ॥
এ জু বহুৎ হরি কি কৃপা ॥
হরি-হরিবংশ ভেদ নহিঁ করৈ । শ্রীহরিবংশ নাম উচ্চরৈ ॥
ছিন-ছিন প্রতি বিসরৈ নহিঁ ॥
প্রীতি সহিত এহ নাম কহাই। সন্তত সকল শুনহু চিত লাই ॥
শ্রীহরিবংশ প্রতাপ যশ ॥৫॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - গুরু থেকে ভক্তির উপদেশ গ্রহণ করিয়া তাঁদের অনুকূলে আচরণ করো। পূর্ববর্তী ছন্দে যাহাতে আর্চন, বন্দনা ইত্যাদি নয় প্রকার ভক্তির উল্লেখ আছে, সেই রূপের ভক্তি দীর্ঘদিন ধরে অব্যাহত রাখতে হবে। যখন উপাসক এইভাবে হরি-ভক্তি করিতে থাকে, তখন তাঁর হৃদয়ে শ্রী হরিবংশ নামের প্রতি রতি (প্রেম) জন্মায়। যখন এমন অবস্থা ঘটে, তখন উপাসককে নিজের উপর শ্রীহরির অপরিসীম কৃপা বিবেচনা করতে হবে। শ্রীহরি ও শ্রীহরিবংশে অভেদ ভাব জানিয়া শ্রীহরিবংশ নাম উচ্চারণ করতে হবে এবং কোনো সময়ে তা ভুলিয়া যেওয়া উচিত নয়। এই শ্রীহরিবংশ নামের উচ্চারণটি প্রেমসহকারে করতে হবে। হে রসিকজন! একাগ্রচিত্তে শ্রীহরিবংশের এই প্রতাপময় যশের নিত্য শ্রবণ কর।
গুরু-উপদেশ চলহু এটি রীতি । শ্রীহরিবংশ-নাম-পদ-প্রীতি ॥
প্রেম-মূল এহ নাম হৈ ॥
প্রেমী রাসিক জপত এহ নাম। প্রেম মগন নিজ বন বিশ্রাম ॥
শ্রীহরিবংশ যাহাঁ রহেঁ ॥
প্রেম-প্রবাহ পরৈ জন সোই । তব কো লোক-বেদ-সুধি হোই ॥
জব শ্রীহরিবংশ কৃপা করি ॥
ব্রত-সংযম তব কউন করাই । সন্তত সকল শুনহু চিত লাই ॥
শ্রীহরিবংশ প্রতাপ যশ ॥৬॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - শ্রীগুরু থেকে উপদেশ গ্রহণ করিয়া এমনভাবে ভজন করো, যাতে শ্রী হরিবংশের নাম ও তাঁর চরণকমলে প্রেম জন্মায়। কারণ এই (শ্রী হরিবংশ) নামই প্রেমের মূল, অর্থাৎ এই নামের অনুশীলন দ্বারা উপাসকের হৃদয়ে প্রেমভাবের জন্ম হয়। প্রেমী রসিকগণ এই নামের জপ অব্যাহত রাখে এবং এর ফলে প্রেমমগ্ন হয়ে সহজ প্রেমরূপে সেই শ্রীবৃন্দাবনে বিশ্রাম লাভ করে, যেখানে শ্রী হরিবংশ নিত্য বিরাজমান। শ্রী হরিবংশ নাম থেকে উদ্ভূত প্রেমপ্রবাহে যখন উপাসকের মন নিমগ্ন হয় এবং শ্রী হরিবংশ তৎক্ষণাত কৃপা করেন, তখন উপাসকের কাছে লোক এবং বেদ অর্থাৎ লোকনিয়ম ও বেদশাস্ত্র অনুযায়ী আচরণের চিন্তা থাকে না। এই অবস্থায়, ব্রত ও সংযমের অনুশীলনও কাদের দ্বারা সম্ভব? হে রসিকজন! একাগ্রচিত্তে শ্রী হরিবংশের এই প্রতাপময় যশের নিত্য শ্রবণ কর।
জব এটি নাম হৃদয় আই হৈ । তব সব সুখ সম্পত্তি পাই হৈ ।
শ্রীহরিবংশ সুজস কহৈ ॥
অরু আপনিঁ প্রভুতা নহিঁ সহৈ। তৃণ তেঁ নীচ আপনপৌ কহৈ।
শুভ অরু অশুভ ন জানহিঁ ॥
সমুঝৈ নহিঁ কছূ কুল-কর্ম । সূধৌ চলৈ আপনেঁ ধর্ম ॥
রাসিকনি সোঁ প্রীতম কহৈ ॥
কবহুঁ কাল বৃথা নহিঁ জাই । সন্তত সকল শুনহু চিত লাই ॥
শ্রীহরিবংশ প্রতাপ যশ ॥৭॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - যখন শ্রী হরিবংশ নাম হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন সুখরূপী ধনের প্রাপ্তি ঘটে এবং উপাসক কৃতজ্ঞতাবশত শ্রী হরিবংশের সুযশের গীত গাইতে শুরু করে। শ্রী হরিবংশ নামের প্রভাবে প্রেমের উদয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উপাসকের হৃদয়ে স্বভাবতই দয়াশীলতা জন্মায়, এবং তিনি কোনো রকম প্রভুত্ব বা মান-মর্যাদা সহ্য করতে পারেন না। তিনি নিজেকে ঘাসের তুলনায়ও নীচে মনে করতে শুরু করেন এবং তাঁর দৃষ্টিতে শুভ ও অশুভের পার্থক্য বিলীন হয়ে যায়। তিনি নিজের কুলের কর্মের প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন হয়ে, সরাসরি প্রেমধর্মের অনুশীলনে মনোনিবেশ করেন। প্রেমী রসিক উপাসকগণ তাঁহার কাছে অতি প্রিয় হয়ে ওঠে। তিনি সদা শ্রী হরিবংশ নাম এবং বচনের অনুশীলনে নিমগ্ন থাকেন এবং নিজের সময়ের এক মুহূর্তও নষ্ট করেন না। হে রসিকজন! একাগ্রচিত্তে শ্রী হরিবংশের এই প্রতাপময় যশের নিত্য শ্রবণ কর।
জব শ্রীহরিবংশ নাম জানি হৈ। তব সব হিঁ তেঁ লঘু মানি হৈ ।
হঁসি বলৈ বহু মান দে ॥
তারু সম সহন শীলতা হৈ । পরম উদার কহৈ সব কোই ॥
সোচ ন মন কবহুঁ করে ॥
শ্রীহরিবংশ সুজস মন রহৈ। কোমল বচন রচন মুখ কহৈ ।
পরম সুখদ সব কাউ সদা ॥
দুখদ বচন কবহুঁ ন কহাই । সন্তত সকল শুনহু চিত লাই ॥
শ্রীহরিবংশ প্রতাপ যশ ॥৮॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - শ্রী হরিবংশ নামের পরিচয় লাভের পর, উপাসক নিজেকে সকলের মধ্যে ক্ষুদ্র মনে করতে শুরু করে এবং সকলের পূর্ণ সম্মান বজায় রেখে তাঁদের সঙ্গে হাস্যোজ্জ্বলভাবে আলাপচারিতা করে। সেই (সাধক)-এর মধ্যে বৃক্ষের মতো ধৈর্য্য জন্মায়, অর্থাৎ শীত-গরম, সুখ-দুঃখ সমানভাবে গ্রহণ করতে পারে। যাঁদের সঙ্গে তিনি পরিচিত হন, তাঁরা তাঁকে পরম উদার মনে করে এবং তিনি নিজের মনকে কোনো চিন্তায় বেষ্টিত হতে দেন না। তাঁর মন সদা শ্রী হরিবংশের সুযশ দ্বারা আবৃত থাকে, অর্থাৎ তাঁদের প্রেমরূপতার অনুভূতি সর্বদা বিরাজমান থাকে। এর প্রেরণায় তিনি সর্বদা কোমল বচন উচ্চারণ করেন। তাঁর মাধ্যমে সর্বদা অন্যরা পরম সুখ লাভ করে এবং তাঁর মুখ থেকে কখনো কষ্টদায়ক শব্দ বের হয় না। হে রসিকজন! এমন আশ্চর্য প্রভাবশালী শ্রী হরিবংশের প্রতাপময় যশ একাগ্রচিত্তে নিত্য শ্রবণ কর।
প্রগট ধর্ম জৈসে জানিয়ে। শ্রীহরিবংশ নাম যা হিয়ে ॥
নাম সিদ্ধি পরিচানিয়ে ॥
শ্রীহরিবংশ নাম সব সিদ্ধি । সবৈ রাসিক বিলসেঁ নব-নিদ্ধি ॥
ভুগতেঁ, দেহিঁ ন যাচহিঁ॥
পোষণ ভরণ ন চিন্ত করাহিঁ। শ্রীহরিবংশ বিভব বিলসাহিঁ ॥
বৃন্দাবন কি মাধুরী ॥
গুন গাবত জু রাসিক সচু পাই। সন্তত সকল শুনহু চিত লাই ॥
শ্রীহরিবংশ প্রতাপ যশ ॥৯॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - যে উপাসকের হৃদয়ে শ্রী হরিবংশ নাম সম্পূর্ণ মহিমায় প্রতিষ্ঠিত হয়, তাঁর হৃদয়ে শ্রী হরিবংশের ধর্মের আলো অনুভব করা উচিত। ধর্মের এই প্রকাশকে শ্রী হরিবংশ নামের সিদ্ধি (ফল) হিসাবে মানা উচিত। কারণ শ্রী হরিবংশ নামের মধ্যে সমগ্র সিদ্ধিসমূহ (সফলতা) নিহিত রয়েছে এবং তাঁর চরণাশ্রিত সকল রসিকজন নবনিধির সুখ ভোগ করে। এই রসিকজনেরা নিজে এই সিদ্ধি ও নিধি ভোগ করে, অন্যকে দান করে, কিন্তু কারও কাছে প্রার্থনা করে না। রসিকজনেরা নিজের আহার-পানীয়ের কোনো চিন্তা না করে বৃন্দাবনের স্বাভাবিক মাধুর্যরূপ শ্রী হরিবংশের বৈভব উপভোগ করে চলেন। এই সহজ বন-মাধুর্য ভোগের মাধ্যমে পরম সুখ লাভ করে রসিকজনেরা শ্রী হরিবংশ নামের আশ্চর্য গুণের গীতি করে এবং এর ফলে তাঁদের চিত্তে দ্বিগুণ রঙের প্রভাব পড়ে। হে রসিকজন! একাগ্রচিত্তে এমন শ্রী হরিবংশের প্রতাপময় যশের নিত্য শ্রবণ কর।
শ্রীহরিবংশ ধর্ম জে ধরহিঁ। শ্রীহরিবংশ নাম উচ্চরহিঁ ॥
তে সব শ্রীহরিবংশ কে ॥
শ্রবণ শুনহিঁ জে শ্রীহরিবংশ । মুখ বরনত বাণী হরিবংশ ॥
মন সুমিরন হরিবংশ কাউ ॥
এঈসে রাসিক কৃপা জো করহিঁ । তউ হমসে সেবক নিস্তরহিঁ ॥
জুঠন লাই পাবেঁ সদা ॥
‘সেবক’ শরণ রহৈ গুণ গাই । সন্তত সকল শুনহু চিত লাই ॥
শ্রীহরিবংশ প্রতাপ যশ ॥১০॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - যে রসিকজনেরা শ্রী হরিবংশের উপর উল্লিখিত ধর্মের লক্ষণ ধারণ করে এবং শ্রী হরিবংশের নাম উচ্চারণ করে, তাঁদের সকলকেই শ্রী হরিবংশই মনে করতে হবে। যারা তাদের শ্রবণের মাধ্যমে শ্রী হরিবংশ নাম শুনে, নিজের মুখে শ্রী হরিবংশের বচনের বর্ণনা করে এবং হৃদয়ে তাঁর স্মরণ রাখে, এমন রসিকদের কৃপা হলে আমাদের মতো সেবকের কাজ সম্পন্ন হয়, অর্থাৎ বস্তুটির প্রাপ্তি ঘটে এবং আমরা সদা তাঁদের ‘জুঠন’ গ্রহণ করে নিজের পুষ্টি করি। সেবক জী বলেন— আমি শ্রী হরিবংশের গুণগান করিয়া সদা তাঁর শরণে অবস্থান করি। হে রসিকজন! একাগ্রচিত্তে এমন শ্রী হরিবংশের প্রতাপময় যশের নিত্য শ্রবণ কর।
জৈ জৈ শ্রীহিত নাম প্রতাপ তৃতীয় প্রকরণ কি জৈ জৈ শ্রীহিত হরিবংশ !

৪. শ্রীহিত বাণী প্রতাপ


সমুঝৌ শ্রীহরিবংশ সুবাণী। রসদ মনোহর, সব জগ জানী ॥
কোমল, ললিত, মধুর পদ শ্রেণী। রসিকন কউঁ জু পরম সুখ দেঁনী
শ্রীহরিবংশ নাম উচ্চার। নিত বিহার রস কহ্যৌ অপর ॥
শ্রীবৃন্দাবন-ভূমি বখানৌঁ। শ্রীহরিবংশ কহেঁ তে জানৌঁ ॥
শ্রীহরিবংশ-গিরা রস সূধী। কছূ নহিঁ কহৌঁ আপনিঁ বুধী ॥
শ্রীহরিবংশ -কৃপা মতি পাউঁ। তব রসিকন কউঁ গাই শুনাউঁ ॥১॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - শ্রী সেবক জী বলেন— শ্রী হরিবংশের সুন্দর বচনকে সম্পূর্ণরূপে বোঝার চেষ্টা করা উচিত। এই বচন রসদায়ক এবং মনোহর (মন গ্রাহ্য) এটি সম্পূর্ণ জগৎ জানে। এই বচনের পদশ্রেণী, অর্থাৎ শব্দসমষ্টি কোমল, ললিত, মধুর এবং কাব্যমর্মজ্ঞ প্রেমী রসিকজনদের পরম সুখ প্রদানকারী। (যে বচনের উচ্চারণে কর্কশতা নেই এবং সহজভাবে উচ্চারিত হয়, তাকে ‘কোমল’ বলা হয়; যার অক্ষর-মৈত্রী সুমধুর, তাকে ‘ললিত’; এবং যার মধ্যে দিভ্য শৃঙ্গাররসের বর্ণনা আছে, তাকে ‘মধুর’ বলা হয়।) এই বচনের প্রতিটি পদে শ্রী হরিবংশ নামের উচ্চারণ করা হয়েছে, অর্থাৎ শ্রী হরিবংশ নামের ছাপ রেখে অপরিসীম নিত্যবিহার রসের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এই বচনে বর্ণিত বিষয়ের পরিচয় দেওয়ার জন্য সেবক জী বলেন— প্রারম্ভে আমি শ্রীবৃন্দাবন ভূমির বর্ণনা করি, যার পরিচয় আমি শ্রী হরিবংশবচন থেকে পেয়েছি। শ্রী হরিবংশের বচনের একান্ত দিভ্য রসসম্পন্নতা রয়েছে, অর্থাৎ সম্পূর্ণরূপে রসময়। অতএব, এর সম্পর্কে আমি নিজের সাধারণ বুদ্ধি দিয়ে কিছু বলার অক্ষম। যদি শ্রী হরিবংশ-কৃপা প্রদত্ত বুদ্ধি আমার কাছে আসে, তবে আমি প্রেমী রসিকজনদের জন্য সেই বচনের স্বরূপ ও গুণগান শুনাতে সক্ষম হব।

শ্রীহরিবংশ জু শ্রীমুখ ভাখী । সো বন-ভূমি চিত্ত মেঁ রাখী ॥
হৌঁ লঘু মতি নহিঁ লহৌঁ প্রমাণা । জানৎ শ্রীহরিবংশ সুজানা ॥
নব পল্লব-ফল-ফুল অনন্তা। সদা রহত ঋতু শরদ-বসন্তা
শ্রীবৃন্দাবন সুন্দরতাই । শ্রীহরিবংশ নিত্য প্রতি গাই ॥২॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - শ্রী হরিবংশ জী তাঁর শ্রী মুখের দ্বারা যেই শ্রীবৃন্দাবন ভূমির বর্ণনা দিয়েছেন, সেটি আমি নিজের হৃদয়ে ধারণ করেছি, অর্থাৎ তা আমার হৃদয়ে সঞ্চিত। তবু অল্পবুদ্ধির কারণে আমি এই ভূমির পরিমাণ (দৈর্ঘ্য-প্রস্থ) নিরূপণ করতে অক্ষম। এই পরিমাণ কেবল সুবিজ্ঞ শ্রী হরিবংশই জানেন। শ্রীবৃন্দাবনের বৃক্ষ ও লতাগাছসমূহ অনন্ত নবীন পল্লব (পাতা) ও ফল-ফুল দ্বারা সুসজ্জিত থাকে, এবং সেখানে সদা শরৎ ও বসন্ত ঋতুর সৌন্দর্য বিরাজমান থাকে। শ্রীবৃন্দাবনের এই অসাধারণ সৌন্দর্যের গীত শ্রী হরিবংশ জী নিজের বচনে প্রতিনিয়ত গাইয়া চলেছেন।

শ্রীবৃন্দাবন নব-নব কুঞ্জ । শ্রীহরিবংশ প্রেম-রস পুঞ্জ ॥
শ্রীহরিবংশ করত নিত কেলি । ছিন-ছিন প্রতি নব-নব রস ঝেলি ॥
কবহুঁঁক নির্মিত তরল হিংডোলা । ঝূলত ফুলত করত কলোলা ॥
কবহুঁঁক নব দল সেজ রচাহিঁ । শ্রীহরিবংশ সুরত রতি-গাহিঁ ॥৩॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - শ্রীবৃন্দাবনের নিত্যনতুন কুঞ্জসমূহ শ্রী হরিবংশ জীর প্রেমরসের পুঞ্জ, অর্থাৎ এই কুঞ্জগুলির মধ্যে শ্রী হরিবংশ জীর প্রেমরসই পুঞ্জীকৃত হচ্ছে। এই কুঞ্জসমূহে পরম প্রেমরূপ শ্রী হরিবংশ জী প্রতিক্ষণ নবীন প্রেমরস উপভোগ করে নিত্যক্রীড়া করে চলেন। শ্রীবৃন্দাবনের কুঞ্জসমূহে সঙ্গিনীসমূহ চঞ্চল ঝুলনের সৃষ্টি করে। সেই ঝুলনে বসে শ্রী শ্যামাশ্যাম দুলতে, ফোটতে এবং কলোল করতে থাকেন। কখনও সঙ্গিনীসমূহ নবীন কিশলয়-পল্লব দ্বারা শয্যা তৈরি করে। সেই শয্যায় বসে শ্রী শ্যামাশ্যাম সুরতক্রীড়া অর্থাৎ শৃঙ্গাররসময় প্রেমকেলি করে, এবং শ্রী হরিবংশ জী সেই দুই জনের সুরতরতি, অর্থাৎ সুরতরসের প্রেমের গীত গাইয়া চলেন।

সুরত অন্ত ছবি বরনি ন যাই। ছিন-ছিন প্রতি হরিবংশ জু গাই ॥
আজু সংভারত নাহিঁন গৌরী। অঙ্গ-অঙ্গ ছবি কহৌঁ সু থোরি ॥
নৈন-বৈন-ভূষণ জিহিঁ ভাঁতী। এ ছবি মোপৈ বরনি ন যাতী ॥
প্রেম-প্রীতি রস-রীতি বাড়াই। শ্রীহরিবংশ বচন সুখদাই ॥৪॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - সুরতবিহারের শেষে শ্রী শ্যামাশ্যামের নক্ষত্র, কপোলসহ অন্যান্য অঙ্গসমূহে যে শৃঙ্গারক্রীড়ার চিহ্ন উদ্ভাসিত হয়, তার গীত শ্রী হরিবংশ জী প্রতিক্ষণ করেছেন। সেই অসাধারণ সৌন্দর্যের বর্ণনা আমার দ্বারা সম্ভব নয়। ‘আজ সম্ভরত নাহিন গোড়ি’ এই পদে শ্রী শ্যামাশ্যামের অঙ্গ-অঙ্গের প্রতিচ্ছবির যে বর্ণনা আছে, তা যত বলি, ততই অল্পই থাকে। উক্ত পদে এবং সুরতান্তের অন্যান্য পদে শ্রী শ্যামাশ্যামের নক্ষত্র, বচন এবং ভূষণের অবস্থার বর্ণনা যেভাবে দেওয়া হয়েছে, তা বর্ণনা করা আমার জন্য অসম্ভব। প্রেম, প্রীতি এবং রস-রীতির বৃদ্ধি ঘটানোয় শ্রী হরিবংশের বচন অত্যন্ত সুখদায়ক।
বংশ বজাই বিমোহিত নরী । বলীঁ সং সু নিত্য-বিহারী ॥
পরিরম্ভন চুম্বন রস কেলি । বিহরত কুঁবর কণ্ঠ ভুজ মেলি ॥
সুন্দর রাস রচ্যৌ বন মাঁহিঁ। যমুনা-পুলিন কল্পতরু-ছাঁহি
রাস-রং-রতি বরনী ন যাই। নিত-নিত শ্রীহরিবংশ জু গাই ॥৫॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - নিত্যবিহারী শ্রী শ্যামসুন্দর বাঁশীধ্বনির মাধ্যমে ব্রজের সুন্দরীদের মোহিত করে নিজের কাছে আনে এবং তাঁদের কণ্ঠে বাহু দান করে কুঞ্জের রাজকুমার অর্থাৎ শ্রী শ্যামঘন আলিঙ্গন-চুম্বনময় রসক্রীড়া করেন। শ্রীবৃন্দাবনের যমুনা তটের কল্পতরুর ছায়ায় তিনি সুন্দর রাস রচেন। এই রাসের রঙে যে রতি (প্রেম) উদ্ভাসিত হয়েছে, তা বর্ণনা করা আমার পক্ষে অসম্ভব। শ্রী হরিবংশচন্দ্র জী এই রসপূর্ণ প্রেমের বর্ণনা নিজের বচনে বহু স্থানে করেছেন।
শ্রীহরিবংশ প্রেম-রস গান । রসিক বিমোহিত পরম সুজানা ॥
অংসন পর ভুজ দিয়েঁ বিলোকত। তৃপ্ত ন সুন্দর মুখ অবলোকত ॥
ইন্দু বদন দীখত বিবি ওরা। চারু সুলোচন তৃষিত চকোরা ॥
করত পান রস-মত্ত সদাঈ । শ্রীহরিবংশ প্রেম-রতি গাই ॥৬॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - শ্রী হরিবংশচন্দ্র জী তাঁর বচনে যে প্রেমরসের গীত করেছেন, তা শুনে পরম সুবিজ্ঞ রসিকজনেরা বিমোহিত হয়ে পড়েন। শ্যামাশ্যামরা পরস্পরের কাঁধে বাহু রেখে, অতৃপ্ত নক্ষত্রযুক্ত চোখ দিয়ে একে অপরের সুন্দর মুখের অবলোকন করছেন। দুইপাশেই চন্দ্রবদন দৃশ্যমান এবং দুইপাশেই চক্রবাকের মতো তৃষ্ণার্ত সুন্দর নক্ষত্র রস-মত্ত হয়ে অবিরাম রস পান করছেন। শ্রী হরিবংশ জী এই শ্রী শ্যামাশ্যামের অসাধারণ প্রেমরতির গীত নিজের বচনে করেছেন।
"
শ্রীহরিবংশ সুরীতি শুনাউঁ । শ্যামা-শ্যাম এক সং গাউঁ ॥
ছিন এক কবহুঁ ন অন্তর হোই । প্রাণ সু এক দেহ হঁই দুই ॥
রাধা সং বিনা নহিঁ শ্যাম । শ্যাম বিনা নহিঁ রাধা নাম ॥
ছিন-ছিন প্রতি আরাধত রহহিঁ । রাধা নাম শ্যাম তব কহহিঁ ॥
ললিতাদিকন সং সচু পাবেঁ । শ্রীহরিবংশ সুরত-রতি গাবেঁ ॥৭॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - এবার আমি শ্রী হরিবংশের রসোপাসনার সুন্দর পদ্ধতির বর্ণনা করি, যেখানে শ্যামাশ্যামের গীত একত্রে করা হয়। এই দুইজনের মধ্যে এক ক্ষণেরও পার্থক্য নেই। তাঁদের প্রাণ এক হলেও দেহ দুটি। শ্রী রাধার সংগত ছাড়া কখনও শ্যামসুন্দর থাকেন না, এবং শ্যামসুন্দরের ছাড়া শ্রী রাধার নামও উচ্চারিত হয় না। কারণ শ্রী রাধার নামের উচ্চারণ শ্রী শ্যামসুন্দর তখনই করেন, যখন তাঁরা প্রতিক্ষণ এই নামের আরাধনা করেন। শ্রী রাধা-শ্যামসুন্দর ললিতাদি সঙ্গিনীসহ আনন্দ পান, অর্থাৎ ললিতাদি সঙ্গিনীর সহযোগে তাঁদের পরস্পরের প্রেমলীলা আরও সমৃদ্ধ হয়। শ্রী হরিবংশ জী সঙ্গিনী রূপে এই লীলায় মিলিত হয়ে তাঁদের সুরতরতি, অর্থাৎ শৃঙ্গাররসময় প্রেমরসের গীত গাইয়া চলেন।

শ্রীহরিবংশ গিরা-যশ গায়েঁ । শ্রীহরিবংশ রহত সচু পায়েঁ ॥
শ্রীহরিবংশ নাম প্রসঙ্গা । শ্রীহরিবংশ-গান এক সংগা ॥
মন-ক্রম-বচন কহৌঁ নিত তেরেঁ । শ্রীহরিবংশ প্রাণ-ধন মেরে ॥
সেবক শ্রীহরিবংশহি গায়েঁ। শ্রীহরিবংশ নাম রতি পায়েঁ ॥৮॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - শ্রী হরিবংশের বচনের যশগান করার মাধ্যমে, অর্থাৎ শ্রী হরিবংশবচনের গুণাবলি ও বিশেষত্বের যশগান করার মাধ্যমে শ্রী হরিবংশ জী আনন্দের অনুভূতি পান। সেবক জী বলেন— আমি আমার মন, বচন এবং কর্মকে এক সূত্রে গাঁথে উচ্চস্বরে এইভাবে বলি যে শ্রী হরিবংশ আমার প্রাণধন, অর্থাৎ আমার মন এবং বচনের একমাত্র এই ভক্তি, এবং আমার কর্মও এই ভক্তির অনুগত হয়। আমি শ্রী হরিবংশের গীত গাইয়া চলি এবং এর ফলস্বরূপ শ্রী হরিবংশের নামের প্রতি রতি, অর্থাৎ প্রেম, ক্রমাগত অর্জন করি।

জয়তি জগদীশ-যশ জগমগৎ জগত-গুরু,
জগত-বন্দিত সু হরিবংশ-বাণী ॥
মধুর, কোমল সুপদ, প্রীতি আনন্দ রস,
প্রেম বিস্তরৎ হরিবংশ-বাণী ॥
রসিক রস-মত্ত শ্রুতি শুনত পীভঁত রস,
রসনি গাবন্ত হরিবংশ-বাণী ॥
কহৎ হরিবংশ-হরিবংশ-হরিবংশ হিত,
জপত হরিবংশ-হরিবংশ-বাণী ॥৯॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - শ্রী সেবক জী বলেন— আমি বিশ্ব দ্বারা বন্দ্যমান এবং বিশ্বের গুরুরূপ শ্রী হরিবংশবচনের জয়জয়কার করি, যেখানে বিশ্বের ঈশ শ্যামাশ্যামের যশ জ্বলে উঠছে। এই বচনের শব্দগুলি মধুর ও কোমল, এবং এটি প্রীতি, আনন্দরস ও প্রেমের প্রসারণ ঘটায়। প্রেমী রসিকজনেরা এই বচন শুনে নিজেদের কান দিয়ে এর স্বাদ গ্রহণ করে রসমত্ত হয়ে যায় এবং নিজের রসনা (জিহ্বা) দ্বারা এই শ্রী হরিবংশবচনের গীত করেন। এই অবস্থা অর্জনের পর তাঁরা দিনরাত শ্রী হরিবংশের নাম উচ্চারণ করেন অথবা শ্রী হরিবংশবচনের জপ (অনুশীলন) অব্যাহত রাখেন।

কহি নিত কে’লি রস খেল বৃন্দাবিপিন,
কুঞ্জ তেঁ কুঞ্জ ডোলনী বখানী ॥
পট ন প্রসন্ত নিকসন্ত ভীথিনু সংঘন,
প্রেম বিহ্বল সু নহিঁ দেহ মানী ॥
মগন জিত-তিত চলত, ছিন সু ডগমগ মিলত,
পন্থ বন দেত অতি হেত জানী ॥
রসিক হিত পরম আনন্দ অবলোকি তন,
সরস বিস্তরৎ হরিবংশ-বাণী ॥১০॥
Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - শ্রী হরিবংশচন্দ্র জী শ্রীবৃন্দাবনের রসক্রীড়া রূপ শ্রী শ্যামাশ্যামের নিত্যকেলির বর্ণনা করেছেন হিতচৌরাসী (চৌত্রিশতম) পদে। এতে শ্রী শ্যামাশ্যামের এক কুঞ্জ থেকে অন্য কুঞ্জে ঘোরার উল্লেখ আছে। শ্রী শ্যামাশ্যাম বিপিনের সঘন পথের মধ্যে এমনভাবে চলাফেরা করেন যে তাদের বস্ত্রের স্পর্শ আশেপাশের লতায় হয় না এবং সেই অবস্থায় তারা নিত্য দেহাভিমানহীন ও প্রেমবিহ্বল থাকেন। প্রেম নিমগ্ন অবস্থায় কখনও একে অপরের সঙ্গ ছেড়ে বিচ্ছিন্ন হন, তবে কয়েক ক্ষণের মধ্যেই বিচ্ছিন্নতার উদ্দীপিত বিহ্বলতায় দুলতে দুলতে আবার মিলিত হন। তাঁদের এই অসাধারণ প্রেম দেখার জন্য শ্রীবৃন্দাবনের অত্যন্ত সংকীর্ণ পথের লতাগুলো দুই পাশে সরিয়ে তাদের চলার পথ তৈরি করে। শ্রী শ্যামাশ্যামের হিত চিন্তায় নিয়োজিত রসিক তথা রসস্বাদী হিতসখীর শরীর এই অসাধারণ হিতময় আচরণ দেখে পরম আনন্দে স্পন্দিত হয় এবং শ্রী হরিবংশবচনের মাধ্যমে তাঁর আনন্দানুভূতির প্রকাশ ঘটায়।

বংশ রস-নাদ মোহিত সকল সুন্দরী,
আনি রতি মানি কুল ছাঁড়ি কানি ॥
বাহু পরিরম্ভ নীভি উরজ পরসি হঁসি,
উমঙি রতিপতি রমিত রীতি জানী ॥
জুঠ জুভতিনু খচিত, রাসমণ্ডল রচিত,
গান গুন নৃত্য আনন্দ দানী ॥
তত্ত থেই-থেই করত, গতিব নৌতন ধরত,
রাস রস রচিত হরিবংশ বাণী ॥১১॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - রাসক্রীড়ায় বাঁশীনাদ দ্বারা বিমোহিত সমস্ত ব্রজসুন্দরী তাঁদের কুল মর্যাদা বিসর্জন দিয়ে প্রেমপরবশ ভাব নিয়ে মিলিত হয়েছিলেন। এই ক্রীড়ায় শ্রী শ্যামসুন্দর তাঁদের বাহু দিয়ে আলিঙ্গন এবং নীভি, উরোজের সহাসস্পর্শ দ্বারা সমাগত গোপীদের প্রেম (কাম) কেলির উদ্দাম রীতি অনুধাবন করালেন। এর জন্য শ্রী শ্যামসুন্দর যুবতীদের সঙ্গে রচিত রসমণ্ডল সৃষ্টি করেন এবং তাতে আনন্দদায়ক গান ও নৃত্যের গুণ প্রকাশিত করেন। এই মণ্ডলে মিলিত শ্রী শ্যামঘন ও গোপীরা নানা নতুন গতিতে নৃত্য করে আনন্দ উদযাপন করেন। শ্রী হরিবংশবচন এই রাসরসের রঙে রঙ্গিন হয়েছে।
রাস-রস-রচিত বাণী সু প্রগটিত জগত,
শুদ্ধ অবিরুদ্ধ প্রসিদ্ধ জানী ॥
শ্যাম-শ্যামা প্রগট, প্রগট অক্ষর নিকট,
প্রগট রস শ্রবৎ, অতি মধুর বাণী ॥
সো জু বাণী রসিক, নিত্য নিশি-দিন রটত,
কহৎ অরু শুনত, রস-রীতি জানী ॥
তাহি তজি অর গাউঁ ন কবহুঁ কছূ,
প্রাণ রমি রহৈ হরিবংশ-বাণী ॥১২॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - শ্রী হরিবংশচন্দ্র জী যে বচন প্রকাশ করেছেন, যা রাসরস দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে, তা জগতে শুদ্ধ, অবিরুদ্ধ এবং প্রসিদ্ধ। অর্থাৎ এতে নিত্যবিহার রসের শুদ্ধ বর্ণনা থাকলেও তা শ্রীমদ্ভাগবতে বর্ণিত প্রসিদ্ধ রাসলীলা থেকে বিরোধপূর্ণ নয়। এতে নিত্যবিহারের শুদ্ধ রসপদ্ধতির মূল বর্ণনা থাকলেও প্রসিদ্ধ রসপরিপাটির সঙ্গে কোনও বিরোধ নেই। শ্যাম-শ্যামা প্রগট আদি-নিত্যপ্রগট শ্রী শ্যামাশ্যাম শ্রী হরিবংশবচনের অক্ষরে প্রকাশিত রূপে ঝলকিত হন। এই অত্যন্ত মধুর বচনে শ্রী শ্যামাশ্যামের প্রেমকেলির বর্ণনার কারণে বচনটি প্রকাশিত রূপে প্রেমরস শোনায়। সোজু বচন ইত্যাদি—এই বচনের রসিকগণ নিত্য অাহারনিশ অনুশীলন করেন, কারণ এর বর্ণনা ও শ্রবণ থেকে তাঁরা শ্রী হিতাচার্যের রস রীতির জ্ঞান পান। তাই তজি এবং অন্যান্য—শ্রী সেবক জী বলেন, এই বচন ছাড়া আমি কখনও অন্য কিছু গাইব না। আমার প্রাণে শ্রী হরিবংশবচনই নৃত্যরত রয়েছে।

ভাগ-অনভাগ জানত জু নহিঁ আপনৌঁ,
কউঁন-ধউঁ লাভ অরু কউঁন হানি ॥
প্রগট-নিধি ছাঁড়ি কৎ ফিরত রুঁকা করত,
ভরম ভটকত সু নহিঁ ভুল জানী ॥
প্রীতি বিনু রীতি রুখী জু লাগতি সকল,
জুগতি করি হত কৎ কবিত-মানী ॥
রসিক জো সদ্য চাহত জু রসরীতি ফল,
তউ কহৌঁ অরু শুনৌঁ হরিবংশ-বাণী ॥১৩॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - ভাগ, অভাগ ইত্যাদি—যে সমস্ত লোক বুঝতে পারেনা যে তাঁদের শুভ ভাগ্য কোনটিতে এবং অশুভ ভাগ্য কোনটিতে, অথবা লাভ কোনটিতে এবং ক্ষতি কোনটিতে, প্রগট নিধি ছাড়ি ইত্যাদি—এমন লোকরা শ্রী হরিবংশবচন রূপী প্রগট নিধি ত্যাগ করে দান-পান এবং উপকারের জন্য বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়ান। তবে বিভ্রান্তিতে ভাসলেও তাঁরা নিজেদের ভুল বুঝতে পারেন না। প্রীতি বিনু রীতি রুক্ষ ইত্যাদি—প্রীতি ছাড়া কাব্য-সৃষ্টি সম্পর্কিত সমস্ত রীতি নিস্প্রাণ মনে হয়। তুমি যুক্তি পূর্ণ রচনা করেও কেন অকারণে কাব্যাভিমানী হচ্ছ? অতএব, হে রসিকগণ! যদি তোমাদের উদ্দেশ্য রসরীতির ফলরূপ প্রেমানুভব লাভ করা হয়, তবে শ্রী হরিবংশবচনের বর্ণনা শোন এবং অনুশীলন করো।

ইহৈ নিত-কে’লি, এঈ জু নাইক নিপুণ,
ইহৈ বন ভূমি নিত-নিত বখানী ॥
বহুৎ রচনা করত, রাগ-রাগিনী ধরত,
তান বন্ধান সব থাঁনি আনি ॥
য্যৌঁ মুন্দ নহিঁ মিলত টকসার তেঁ বাহিরী,
লাখ মেঁ গেইর মূহরী জু জানী ॥
যৌঁ জু রস-রীতি বরনত ন থাঁই মিলত
জো ন উচ্চরত হরিবংশ - বাণী ॥১৪॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - তারা প্রতিদিনই এই নিত্যকেলি, এই দক্ষ নায়ক-নায়িকা শ্যামাশ্যাম এবং এই শ্রী বৃন্দাবন ভুমির বর্ণনা করেন। এই লোকেরা প্রচুর পদ রচনা করেন, সেই পদগুলোকে রাগ-রাগিনীর সঙ্গে বাঁধেন এবং সঙ্গীতের তান ও তালসহ সঠিকভাবে গাইতেন। তবুও, যেমন মুদ্রা কারখানার বাইরে সঠিক মুদ্রা খুঁজে পাওয়া যায় না এবং সৎ পরীক্ষক লাখ মুদ্রার মধ্যে এক খোটা মুদ্রাও চেনতে পারেন, তেমনই যতক্ষণ শ্রী হরিবংশবচনের অনুশীলন করা না হয়, ততক্ষণ রসরীতির সঠিক বর্ণনা সম্ভব নয়।

রসিক বিনু কহেঁ সব হি জু মানত বুরৌ,
রসিকৈ কহৌ কাইসে জু জানী ॥
আপনি-আপনি থাউর জেই তঁহাঁ,
আপনি বুধি কে হত মানী ॥
নিপট করি রসিক জো হোহু তাইসে কহৌ,
অব জু এহ শুনৌঁ মেরী কাহানী ॥
জরু তুমি রসিক রস-রীতি কে ছাড়িলে,
তাউরু মন দেহু হরিবংশ-বাণী ॥১৫॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - রসিক না বলে সবাই খারাপ মনে করে, কিন্তু বুঝতে হবে রসিকতা বলতে কী বোঝায়। কারণ যারা যেরকম ধারণা নিয়ে বসে আছেন, তারা সেই বিষয়ে নিজেদের বুদ্ধির ওপর নির্ভর করছেন (এবং অন্য কারও কথা মানতে প্রস্তুত নন)। কিন্তু যদি পূর্ণরূপে রসিক হওয়ার ইচ্ছা থাকে, তবে আমার বলা কথা শোন। যদি তুমি প্রকৃত রসরীতির রসিক হতে চাও, তবে শ্রী হরিবংশবচনের প্রতি মনোযোগ দাও।

বেদ-বিদ্যা পড়ত কর্ম-ধরমন করত,
জলপিঁ তন-কল্প কে অবধি আনি ॥
চারু গতি ছাঁড়ি সংসার ভটকত ভ্রমত,
আস কি পাশে নহিঁ তোড়ি জানী ॥
সকল স্বার্থ করত রহত জন্মত-মরত,
দুখ অরু সুখ কে হত মানী ॥
ছাঁড়ি জঞ্জার কাইসে ন নিশ্চয়ধরত,
এক কিন রমত হরিবংশ-বাণী ॥১৬॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - কিছু লোক বেদ, জ্যোতিষ ও অন্যান্য বৈচিত্র্যপূর্ণ বিদ্যা অধ্যয়ন করে এবং কর্ম-ধর্ম পালন করে (যেমন: বর্ণাশ্রম ধর্ম, তীর্থ সেবন, জপ, তপ এবং ব্রত) এবং এই সমস্ত বিষয়ে অদ্ভুত-অদ্ভুত মন্তব্য করে নিজের শরীরপাতে বা মৃত্যুর মেয়াদ আহবান করে। অর্থাৎ তারা মৃত্যুর আগে পর্যন্ত এইসব বিষয়ে ব্যস্ত থাকে। এমন লোকেরা (ভক্তিভাবের) সুন্দর গতিকে ত্যাগ করে পৃথিবীতে ঘুরে বেড়ায় এবং আশা ও বন্ধনের পাঁশ ছাড়তে পারে না। তারা সম্পূর্ণরূপে স্বার্থপর (সকাম কর্ম) হয়, বারবার জন্ম-মৃত্যুর অধীনে পড়ে এবং সুখ-দুঃখে অহংকারী হয়ে থাকে। রসোপাসনার সুন্দর গতিকে অনুশীলন করা রসিকজন এই ধরনের বিভ্রান্তিতে পড়ে না। ছাঁড়ি, জঞ্জার ইত্যাদি — তুমি কেন এই সব জঞ্জাল থেকে নিজের মনকে বের করে একনিষ্ঠ হও এবং শ্রী হরিবংশবচনের রসাস্বাদে মনযোগী হও না?

বৃথা বলগন করত দ্যৌস খোবত সকল,
সোবতন রাত নহিঁ যাত জানী ॥
এঈসে ভাঁতি সমুঝৌ ন কবহুঁ কছূ,
কউঁ সুখ-দুখ কো লাভ-হানি ॥
তব সুখ হরিবংশ-গুণ নাম রসনা রটত,
অরু বহু বচন অতি দুখ-দানী ॥
হানি হরিবংশ কে নাম অন্তর পরে,
লাভ হরিবংশ উচ্চরত বাণী ॥১৭॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - তোমরা সারাদিন বেকার কথাবার্তায় ব্যয় কর, আর রাত অজানা ভাবে ঘুমে কেটে যায়। ঠিক এভাবে, তোমরা জীবনে কখনও বুঝতে পারো না সুখ কী এবং দুঃখ কী? লাভ কী এবং ক্ষতি কী? আমি তোমাদের এই চারটির প্রকৃত রূপ বলছি, মন দিয়ে শুনো। শ্রী হরিবংশের নাম-বচন জিহ্বা দ্বারা উচ্চারণ করা—এটাই সুখ। এর বাইরে সব বাক্য দুঃখরূপ। ঠিক তেমনি, শ্রী হরিবংশ নামের জপে অন্তরায় পড়া—এটাই ক্ষতি, এবং শ্রী হরিবংশ বচনের উচ্চারণ করা—এটাই লাভ।
নাম-বাণী নিকট শ্যাম শ্যামা প্রগট,
রহত নিশি-দিন পরম প্রীতি জানী ॥
নাম-বাণী শুনত শ্যাম শ্যামা সুবস,
রসদ মাধুর্য অতি প্রেম দানী ॥
নাম-বাণী জহা শ্যাম-শ্যামা তঁহাঁ,
শুনত গাবন্ত মো মন জু মানী ॥
বলিত শুভ নাম বলি বিশদ কীর্তি জগত,
হৌঁ জু বলি জাঁওঁ হরিবংশ-বাণী ॥১৮॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা – শ্রী হরিবংশ নাম ও বচনের নিকটে শ্রী শ্যাম-শ্যামা, অর্থাৎ শ্রী হরিবংশচন্দ্র জীর সেই শ্রী শ্যাম-শ্যামের প্রতি অনুপম প্রীতি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে, সদা প্রাকট্যমান থাকেন। শ্রী হরিবংশের নাম ও বচন—মাধুর্য-রস এবং অপরিমেয় প্রেমের দাতা। অতএব, শ্রী শ্যাম-শ্যামা এই নাম ও বচন উপাসকের মুখ থেকে শুনলেই তার প্রতি অনুরক্ত হয়ে, তার অনুগত হয়ে যান। যেখানে শ্রী হরিবংশ নাম ও বচনের অনুশীলন হয়, সেখানে শ্রী শ্যামাশ্যাম উপস্থিত থাকেন। এজন্যই এই নাম-বচনের শ্রবণ ও গায়ন আমার মনকে অত্যন্ত প্রিয় ও রুচিকর মনে হয়। যে পরম মঙ্গলময় শ্রী হরিবংশ নামের মধ্যে আবদ্ধ বিশদ কীর্তি সমগ্র জগতে বিস্তৃত হচ্ছে, তার আমি বলিহারী দিই। ঠিক একইভাবে শ্রী হরিবংশ বচনেরও আমি বলিহারী।

বলি-বলি শ্রীহরিবংশ নাম বলি-বলিত বিমল যশ ॥
বলি-বলি শ্রীহরিবংশ কর্ম-ব্রত কৃত সু নাম বস ॥
বলি-বলি শ্রীহরিবংশ বরন-ধরমন গতি জানত ॥
বলি-বলি শ্রীহরিবংশ নাম কালি প্রগট প্রমাণত ॥
হরিবংশ নাম সু প্রতাপ বলি, বলিত জগত কিরতি বিশদ ॥
হরিবংশ বিমল বাণী সু বলি, মৃদু কমনীয় সু মধুর পদ ॥১৯॥
Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা – আমি বহুবার বলিহারী হই সেই শ্রী হরিবংশ নামের, যার সাথে নির্মল কীর্তি আবদ্ধ। আমি বহুবার বলিহারী হই সেই শ্রী হরিবংশের, যিনি বৈদিক কর্ম, ব্রতাদি নামের অধীন করেছেন। আমি বহুবার বলিহারী হই সেই শ্রী হরিবংশের, যারা বর্ণাশ্রম ধর্মের গতিকে জানেন। আমি বহুবার বলিহারী হই সেই শ্রী হরিবংশের, যিনি কলিকালে ভগবন্নামের অতুল শক্তিকে স্পষ্টরূপে প্রমাণ করেছেন। আমি বলিহারী হই সেই শ্রী হরিবংশ নাম ও প্রতাপের, যার বিশদ কীর্তি সমগ্র জগতে বিস্তৃত। আমি বলিহারী হই সেই নির্মল শ্রী হরিবংশ বচনের, যার প্রতিটি শব্দ কোমল, সুন্দর ও সুমধুর।

॥ জৈ জৈ শ্রীহিত বাণী প্রতাপ প্রকরণ কি জৈ জৈ শ্রীহিত হরিবংশ ॥

৫. শ্রীহিত ইষ্টারাধন


প্রথম প্রণম্য সুরম্য মতি, মন বুধি চিত্ত প্রসংশ ॥
চরণ শরণ সেবক সদা, সু জৈ জৈ শ্রীহরিবংশ ॥
শ্রীহরিবংশ বিপুল গুণ মিষ্টং । শ্রীহরিবংশ উপাসক ইষ্টং ॥
শ্রীহরিবংশ কৃপা মতি পাউঁ। শ্রীহরিবংশ বিমল গুণ গাউঁ ॥
গাউঁ হরিবংশ নাম যশ নির্মল, শ্রীহরিবংশ রমিত প্রাণং ॥
কারজ হরিবংশ প্রতাপ সু উদ্দিত, কারণ শ্রীহরিবংশ ভনং ॥
বিদ্যা হরিবংশ মন্ত্র চতুরক্ষর, জপত সিদ্ধ ভব-উদ্ধরণং ॥
জৈ-জৈ হরিবংশ জগত-মঙ্গল-পর, শ্রীহরিবংশ-চরণ-শরণং ॥১॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা – আমি আমার মন, বুদ্ধি ও চিত্তের দ্বারা প্রশংসনীয়, অত্যন্ত মনোহর মতি সম্পন্ন শ্রী হরিবংশকে প্রথমে প্রণাম জানাই এবং সদা তাঁর পদতলে আশ্রয় গ্রহণ করি। আমি, সেবক, তাঁর জয় জয়কার করি। শ্রী হরিবংশের গুণ অসীম বিস্তৃত এবং মধুর। শ্রী হরিবংশই উপাস্য, শ্রী হরিবংশই ইষ্ট। সেবকজি বলেন, আমি শ্রী হরিবংশের কৃপায় সন্মতি প্রাপ্ত হয়ে তাঁর নির্মল গুণের গান করব। গাওঁ হরিবংশ আদি: আমি শ্রী হরিবংশ নামের যশগান করি, কারণ আমার প্রাণে প্রেমরূপ শ্রী হরিবংশই রমণীয়ভাবে অবস্থান করছেন। কর্মরূপে শ্রী হরিবংশের প্রতাপ উদিত হচ্ছে, এবং সেই কর্মের মাধ্যমে তিনি সর্বদা সমভাবে বিদ্যমান। বিদ্যা হরিবংশ মন্ত্র আদি: হ-রি-वं-শ নামই সেই চার অক্ষরের মন্ত্র, যার জপ দ্বারা তৎক্ষণাৎ সংসার থেকে মুক্তি এবং সিদ্ধি লাভ হয়। জগতের জন্য পরম মঙ্গলময় শ্রী হরিবংশচন্দ্র জীর জয় জয়কার হোক। আমি তাঁর পদতলে আশ্রিত।

হরিরীতি অক্ষর বীজ ঋষি, বাঁশী শক্তি সু অংস ॥
নখ-শিখ সুন্দর ধ্যান ধরী, সু জৈ জৈ শ্রীহরিবংশ ॥
শ্রীহরিবংশ সু সুন্দর ধ্যানং । শ্রীহরিবংশ বিশদ বিজ্ঞানং ॥
শ্রীহরিবংশ নাম গুণ শ্রূপং । শ্রীহরিবংশ প্রেম রস রূপং ॥
রসময় হরিবংশ পরম-পরমাক্ষর, শ্রীহরিবংশ কৃপা-সদনং ॥
আত্মা হরিবংশ প্রগট পরমানন্দ, শ্রীহরিবংশ প্রমাণ মনং ॥
জীবন হরিবংশ বিপুল সুখ-সম্পতি, শ্রীহরিবংশ বলিত বরনং ॥
জৈ-জৈ হরিবংশ জগৎ-মঙ্গল পর, শ্রীহরিবংশ-চরণ-শরণং ॥২॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - এই মন্ত্রে ‘হরি’ শব্দটি বীজ এবং ‘বংশ’ অর্থাৎ বংশী ঋষি। ঋষি হওয়ার সঙ্গে বংশী সুন্দর অংশযুক্ত শক্তি। যাদের নখ থেকে শিখা পর্যন্ত সুন্দর রূপ ধ্যান করার যোগ্য, এমন শ্রী হরিবংশের আমি জয় জয়কার করি। শ্রী হরিবংশ সু সুন্দর ধ্যান ইত্যাদি :- শ্রী হরিবংশ ধ্যানরূপ এবং শ্রী হরিবংশই বিশদ বিজ্ঞানরূপ। শ্রী হরিবংশ নাম-গুণ-রূপ ইত্যাদি :- শ্রী হরিবংশ নাম এবং গুণরূপশীল, অর্থাৎ তাদের নাম ও গুণ তাদের রূপের সঙ্গে অভিন্ন। রসময় শ্রী হরিবংশই পরাত্পর অক্ষর বা অমর তত্ত্ব এবং শ্রী হরিবংশই করুণার আসন বা আশ্রয়। আত্মা হরিবংশ প্রতাপমান আনন্দ ইত্যাদি :- শ্রী হরিবংশ আত্মার রূপ এবং পরম আনন্দের প্রকাশ রূপ (মূর্তিমান বিভ্রগ)ও তিনি। তিনি মনের জন্য প্রমাণরূপ, অর্থাৎ আত্মরূপ শ্রী হরিবংশের স্বীকৃতির জন্য মনের অন্য কোনো প্রমাণের প্রয়োজন নেই। জীবন হরিবংশ বিপুল সুখ-সম্পদ ইত্যাদি :- শ্রী হরিবংশই আমার জীবন অর্থাৎ প্রাণ এবং শ্রী হ-রি-বং-শ এই বর্ণ (অক্ষর) প্রাচুর্যপূর্ণ সুখ-সম্পদে সমৃদ্ধ। এইভাবে জগতমঙ্গলপরায়ণ শ্রী হরিবংশের পায়ের তলে আমার আশ্রয়।

শরণ নিরাপক পদ রমিত, সকল অশুভ-শুভনংস ॥
দেত সহজ নিশ্চল ভক্তি, সু জৈ জৈ শ্রীহরিবংশ ॥
শ্রীহরিবংশ মুদিত মন লোভং । শ্রীহরিবংশ বচন বর শোভং ॥
শ্রীহরিবংশ কায়-কৃত কারং । শ্রীহরিবংশ ত্রিশুদ্ধ বিচারং॥
পূজা হরিবংশ নাম পরমার্থ, শ্রীহরিবংশ বিবেক পরং ॥
ধীরজ হরিবংশ বিরদ বল-বীরজ, শ্রীহরিবংশ অভদ্র হরং ॥
তৃষ্ণা হরিবংশ সুজস রস-লম্পট, শ্রীহরিবংশ কর্ম করণং ॥
জৈ-জৈ হরিবংশ জগৎ-মঙ্গল পর, শ্রীহরিবংশ-চরণ শরণং ॥৩॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - যারা তাদের পদতলে লীন হওয়া উপাসককে পরিপূর্ণ আশ্রয় প্রদান করেন এবং যাঁরা সমস্ত শুভ-অশুভ ধ্বংস করে, অর্থাৎ এটি আমার জন্য শুভ এবং এটি অশুভ—এই ভাবনাকে উপাসকের মন থেকে দূর করে তাকে সহজ ও অচল ভক্তি প্রদান করেন, সেই শ্রী হরিবংশের জয় জয়কার হোক। নিঃসঞ্চল ভক্তি প্রাপ্তির ফলে যে মন আনন্দিত হয়, তাতে যে ধ্যেয় বস্তুতে লোভ জাগে, তা শ্রী হরিবংশই এবং শ্রেষ্ঠ বচন (বাণী) যেভাবে সজ্জিত হয়, তা ও শ্রী হরিবংশই। উপাসকের শরীরের ক্রিয়াকলাপও শ্রী হরিবংশ এবং এভাবে মন, বাণী ও কর্ম—তিনিই শুদ্ধ হয়ে যাওয়া চিন্তাও শ্রী হরিবংশ। শ্রী হরিবংশ নামই পূজা ক্রিয়া এবং সেই নামই পরমার্থ, অর্থাৎ পূজ্য বস্তু, এবং সার-অসার ভেদ প্রকাশকারী পরম বিবেকও শ্রী হরিবংশ। শ্রী হরিবংশই ধৈর্য, যশ, বল ও বীর্য (পরাক্রম) এবং সমস্ত অমঙ্গল দূরকারী। শ্রী হরিবংশের সুন্দর যশ-রসের লম্পট (লোভ), অর্থাৎ তৃষ্ণা (প্রাপ্তির তীব্র আকাঙ্ক্ষা), তা ও শ্রী হরিবংশই এবং সেই তৃষ্ণার শান্তির জন্য যা কিছু কর্ম সম্পাদিত হয়, তা ও শ্রী হরিবংশ। সমগ্র জগতের মঙ্গলকারী এই শ্রী হরিবংশের জয় জয়কার হোক। শ্রী হরিবংশের পদই আমার আশ্রয়।

শ্রীহরিবংশ সুগোত কুল দেব জাতি হরিবংশ ॥
শ্রীহরিবংশ স্বরূপ হিত, ঋদ্ধি সিদ্ধি হরিবংশ ॥
শ্রীহরিবংশ বিদিত বিধি-বেদং। শ্রীহরিবংশ জু তত্ত্ব অভেদং ॥
শ্রীহরিবংশ প্রকাশিত যোগং। শ্রীহরিবংশ সুকৃত সুখ ভোগং ॥
প্রজ্ঞা হরিবংশ প্রতীতি প্রমাণত, প্রীতম শ্রীহরিবংশ প্রিয়ং ॥
গাথা হরিবংশ গীত গুণ গোচর, গূপ্ত গুনত হরিবংশ-গিয়ং ॥
সেবক হরিবংশ-সার সঞ্চিত সব, শ্রীহরিবংশ-ধরম ধরণং ॥
জৈ-জৈ হরিবংশ জগৎ-মঙ্গল পর, শ্রীহরিবংশ চরণ শরণং ॥৪॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - শ্রী হরিবংশ আমার সুন্দর গোত্র, কুল, কুলদেব এবং জাতি; শ্রী হরিবংশই কল্যাণের রূপ অর্থাৎ প্রগট মূর্তিই এবং ঋদ্ধি-সিদ্ধি। শ্রী হরিবংশই বেদগুলোর প্রখ্যাত বিধি অর্থাৎ কর্মকাণ্ডের পদ্ধতি এবং শ্রী হরিবংশই বেদান্তে প্রতিপাদিত অদ্বৈত তত্ত্ব। শ্রী হরিবংশের মাধ্যমে যোগশাস্ত্র প্রকাশিত হয়েছে এবং শ্রী হরিবংশই সুকৃত অর্থাৎ পুণ্যকর্মের ফলরূপ সুখ-ভোগ। ধ্যেয় বস্তুতে বিশ্বাসকে প্রমাণিত করে এমন প্রজ্ঞা (উত্তম বুদ্ধি) শ্রী হরিবংশ। প্রিয় শ্রী হরিবংশই প্রিয়তম, অর্থাৎ সর্বাধিক প্রিয়। প্রত্যক্ষ গুণসমৃদ্ধ ছন্দে গাওয়া কাহিনী তথা ইতিহাস-কথা শ্রী হরিবংশই এবং গুপ্ত, রহস্যময় গুণের ও বাণী শ্রী হরিবংশই। সেবক জী বলেন, আমি উপরোক্ত ছন্দে শ্রী হরিবংশের বৈভবসার সংরক্ষণ করেছি এবং আমি তার ধর্মকে ধারণ করি। সমগ্র জগতের মঙ্গলকারী এই শ্রী হরিবংশের জয় জয়কার হোক। শ্রী হরিবংশের পদই আমার আশ্রয়।

জৈ জৈ শ্রীহরিবংশচন্দ্র, দ্বিজবর কুল-মণ্ডন ॥
জৈ জৈ শ্রীহরিবংশচন্দ্র, কালি-তম ভব খন্ডন ॥
জৈ জৈ শ্রীহরিবংশচন্দ্র, অকলঙ্ক প্রকাশিত ॥
জৈ জৈ শ্রীহরিবংশচন্দ্র, সব জগৎ আভাসিত ॥
হরিবংশচন্দ্র অমৃত বর্ষি, সকল-জন্তু তাপন হরণং ॥
সেবক সমীপ সন্তত রহৈ সু, শ্রীহরিবংশ চরণ শরণং ॥৫॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - ব্রাহ্মণদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ শ্রী ব্যাস মিশ্রের কুলমণ্ডন শ্রী হরিবংশচন্দ্র জীর জয় হোক। কলিয়ুগের অন্ধকারে পূর্ণ সংসারের নাশকারী শ্রী হরিবংশচন্দ্র জীর জয় হোক। নিখলঙ্ক রূপে প্রগট শ্রী হরিবংশচন্দ্র জীর জয় হোক। সমগ্র জগতে যাঁর আভাস ব্যাপ্ত, সেই শ্রী হরিবংশচন্দ্র জীর জয় হোক। শ্রী হরিবংশচন্দ্র জী ভগবদ্ রসেরূপ অমৃত বর্ষণ করে সমস্ত জীবের তাপ হরণ করেন। এমন শ্রী হরিবংশচন্দ্র জীর আমি সেবক নিরন্তর নিকটে থাকি এবং তাঁর পদকমলই আমার আশ্রয়।

! জৈ জৈ শ্রীহিত ইষ্টারাধন প্রকরণ কি জৈ জৈ শ্রীহিত হরিবংশ !

৬. শ্রীহিত ধর্মিন-কৃত


পহিলে হরিবংশ সুনাম কহউঁ ।
হরিবংশ সুধর্মিন সঙ লহউঁ ॥
হরিবংশ সুনাম সদা তিনকে ।
সুখ সম্পতি দম্পতি জূ জিনকে ॥১॥
Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - আমি প্রারম্ভে শ্রীহরিবংশ নামের উচ্চারণ করি এবং এই নামের কৃপায় শ্রীহরিবংশধর্ম ধারণকারী ধর্মীদের সঙ্গ লাভ করি, কারণ যেসব মহাপুরুষের (উপাসকের) সুখসম্পদ দম্পতি শ্রীশ্যামাশ্যম, তাদের সর্বস্বই শ্রীহরিবংশ নাম।
হরিবংশ সুনাম কহউঁ নিত কে।
মিল হী কহউঁ কৃত্য সুধর্মিন কে ॥
হরিবংশ উপাসন হেঁ তিনকে।
সুখ সম্পতি দম্পতি জূ জিনকে ॥২॥
Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - আমি নিরন্তর শ্রীহরিবংশ নাম উচ্চারণ করি এবং এই নামের সঙ্গে মিলিয়ে এখন শ্রীহরিবংশধর্মধারী ধর্মীদের কর্তব্য কিছু কর্ম বর্ণনা করি। (প্রথম কথা এই যে) যাদের সুখসম্পদ শ্রীশ্যামাশ্যম, তাদের উপাসনা শ্রীহরিবংশেরই, অর্থাৎ তারা সকলে শ্রীহরিবংশের উপাসক।

হরিবংশ গিরা রস-রীতি কহে।
সুকৃতি জন সঙতি নিত্য রহে॥
কছু ধর্ম বিরুদ্ধ নহিঁ তিনকে ।
সুখ সম্পতি দম্পতি জূ জিনকে ॥৩॥
Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - যেসব পুণ্যবান ধর্মীজন শ্রীহরিবংশবাণীর ভিত্তিতে রসরীতি বর্ণনা করেন, তাঁদের সঙ্গেই সদা অবস্থান করা উচিত। যাঁদের সুখসম্পদ শ্রীদম্পতি, তাঁদের কোনো কর্মই শ্রীহরিবংশধর্মের বিরুদ্ধ নয়।

হরিবংশ প্রশংসত নিত্য রহে ।
রস রীতি বিবর্ধিত কৃত্য কহে ॥
জু কছূ কুল-কর্ম নহিঁ তিনকে ।
সুখ সম্পতি দম্পতি জূ জিনকে ॥৪॥
Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - যারা নিত্য শ্রীহরিবংশের স্তব করেন, অর্থাৎ ভক্তিভরে তাঁর চরণকমলের ভজন করেন এবং যারা রসরীতির মাধ্যমে শ্রীযুগলের লীলাচরিতের কীর্তন করেন, তাঁদের জন্য — যাঁদের সুখসম্পদ শ্রীদম্পতি — কোনো কুলকর্ম অবশিষ্ট থাকে না।

হরিবংশ সুনাম জু নিত্য রটে।
ছিন জাম সমান ন নৈঁকু ঘটে ॥
বিধি অউর নিষেধ নহিঁ তিনকে ।
সুখ সম্পতি দম্পতি জূ জিনকে ॥৫॥
Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - যারা নিত্য শ্রীহরিবংশের সুন্দর নাম জপ করে চলেছেন, যাঁদের নামস্মরণ প্রতিক্ষণ ও প্রতি প্রহরে সমরূপে অবিচলিত থাকে—একটুও হ্রাস পায় না—তাঁদের জন্য, যাঁদের সুখসম্পদ শ্রীশ্যামাশ্যাম, বিধি ও নিষেধের কোনো বন্ধন থাকে না।

হরিবংশ সুধর্ম জু নিত্য করে ।
হরিবংশ কহী সু নহিঁ বিসরে ॥
হরিবংশ সদা নিধি হেঁ তিনকে ।
সুখ সম্পতি দম্পতি জূ জিনকে ॥৬॥
Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - যারা নিত্য শ্রীহরিবংশের ধর্ম পালন করেন ও তাঁর আজ্ঞা কখনো ভোলেন না, এমন রসিক উপাসকদের জন্য—যাঁদের সুখসম্পদ যুগলবর শ্রীশ্যামাশ্যাম—শ্রীহরিবংশই সর্বদা সর্বস্বনিধি।

হরিবংশ প্রতাপহিঁ জানত হে।
হরিবংশ প্রবোধ প্রমাণত হে ॥
হরিবংশ সু সর্বসু হেঁ তিনকে ।
সুখ সম্পতি দম্পতি জূ জিনকে ॥৭॥
Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - যারা শ্রীহরিবংশের প্রতাপ ও প্রভাবকে হৃদয়ে উপলব্ধি করেন এবং তাঁর উপদেশসমূহকে প্রামাণ্য মনে করেন, এমন উপাসকদের জন্য—যাঁদের সুখসম্পদ যুগলবর শ্রীশ্যামাশ্যাম—শ্রীহরিবংশই তাঁদের সর্বস্ব।

হরিবংশ বিচার পরে জু রহে।
হরিবংশ ধরম্ম ধুরা নিবহে ॥
হরিবংশ নিবাহক হে তিনকে ।
সুখ সম্পতি দম্পতি জূ জিনকে ॥৮॥
Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - যাঁদের মন সর্বদা শ্রীহরিবংশের চিন্তায় নিমগ্ন থাকে, অর্থাৎ যাঁরা তাঁর স্বরূপ, নাম ও রসরূপ বৈভব নিয়েই ভাবিত থাকেন, এবং যাঁরা শ্রীহরিবংশ ধর্মের মর্যাদা রক্ষায় সদা সচেষ্ট, এমন উপাসকদের—যাঁদের সুখসম্পদ যুগলবর শ্রীশ্যামাশ্যাম—সদা পালনকর্তা একমাত্র শ্রীহরিবংশই।

হরিবংশ রসায়ন পীবত হে।
হরিবংশ কহে সুখ জীবত হে।
হরিবংশ পতিব্রত হে তিনকে।
সুখ সম্পতি দম্পতি জূ জিনকে ॥৯॥
Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - যাঁরা শ্রীহরিবংশের নাম-ভাষণরূপ অমৃত পান করে চলেন, এবং শ্রীহরিবংশ নাম উচ্চারণ করতেই যাঁদের জীবন সুখময় হয়ে ওঠে—এমন উপাসকদের, যাঁদের সুখসম্পদ যুগলবর শ্রীশ্যামাশ্যাম, তাদের জন্য শ্রীহরিবংশই চির পতিব্রতা।

হরিবংশ-গিরা রস রীতি ভনে ।
হরিবংশ কহে, হরিবংশ শুনে ॥
হরিবংশ হৃদয় ব্রত হে তিনকে ।
সুখ সম্পতি দম্পতি জূ জিনকে ॥১০॥
Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - যারা হরিবংশ-বাণীতে বর্ণিত রসরীতির কথন করে চলেন, যারা শ্রীহরিবংশকেই বলেন ও শ্রীহরিবংশকেই শোনেন—এমন উপাসকদের, যাঁদের সুখসম্পদ যুগলবর শ্রীশ্যামাশ্যাম, তাঁদের হৃদয়ব্রত শ্রীহরিবংশই; অর্থাৎ তাঁরা আপন সমগ্র হৃদয় শ্রীহরিবংশের প্রতি সমর্পণ করেছেন।

হরিবংশ কৃপা হরিবংশ কহে।
হরিবংশ কহে, হরিবংশ লহে ॥
হরিবংশ সুলাভ সদা তিনকে ।
সুখ সম্পতি দম্পতি জূ জিনকে ॥১১॥
Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - যারা শ্রীহরিবংশের কৃপায় সদা শ্রীহরিবংশ নাম উচ্চারণ করে চলেন এবং সেই নামস্মরণের ফলেই শ্রীহরিবংশের প্রাপ্তি লাভ করেন, সেই উপাসকদের, যাঁদের সুখসম্পদ যুগলবর শ্রীশ্যামাশ্যাম, তাঁদের জন্য শ্রীহরিবংশই চিরকাল শ্রেষ্ঠ লাভরূপ।

হরিবংশ পরায়ণ প্রেম ভরে।
হরিবংশ সু মন্ত্র জপে সুধরে ॥
হরিবংশ সু ধ্যান সদা তিনকে ।
সুখ সম্পতি দম্পতি জূ জিনকে ॥১২॥
Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - যারা শ্রীহরিবংশপ্রেমে পূর্ণ হয়ে শ্রীহরিবংশপরায়ণ, অর্থাৎ সর্বপ্রকারে তাঁর আশ্রিত, এবং যারা শ্রীহরিবংশমন্ত্র জপের দ্বারা নিজ জীবনকে শুদ্ধ ও নির্মল করে তুলেছেন — সেই উপাসকদের, যাঁদের সুখসম্পদ যুগলবর শ্রীশ্যামাশ্যাম, তাঁদের জন্য শ্রীহরিবংশই চিরকাল সুন্দর ধ্যানরূপ।

নিত শ্রীহরিবংশ সু নাম কহে।
নিত রাধিকা - শ্যাম প্রসন্ন রহে ॥
নিত সাধন অউর নহিঁ তিনকে ।
সুখ সম্পতি দম্পতি জূ জিনকে ॥১৩॥
Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - যারা নিত্য শ্রীহরিবংশের সুন্দর নাম উচ্চারণ করে থাকেন, তাঁদের প্রতি শ্রীরাধিকা-শ্যাম সদা প্রসন্ন থাকেন। যাঁদের সুখসম্পদ যুগলবর শ্রীশ্যামাশ্যাম, সেই উপাসকদের জন্য শ্রীহরিবংশনাম ব্যতীত অন্য কোনো সাধন কখনোই নেই।
যব রাধিকা - শ্যাম প্রসন্ন ভয়ে ।
তব নিত্য সমীপ সু খঁচি লয়ে ॥
হরিবংশ সমীপ সদা তিনকে।
সুখ সম্পতি দম্পতি জূ জিনকে ॥১৪॥
Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - যখন শ্রীশ্যামাশ্যাম প্রসন্ন হন, তখন তাঁরা উপাসককে নিত্যই নিজেদের নিকটে টেনে নেন, অর্থাৎ তাঁকে স্থায়ীভাবে নিজের সান্নিধ্য দান করেন। যাঁদের সুখসম্পদ যুগলবর শ্রীশ্যামাশ্যাম, সেই উপাসকদের সন্নিকটে শ্রীহরিবংশ সদা বিরাজমান থাকেন।
নিত-নিত শ্রীহরিবংশ নাম ছিন ছিন জু রটত নর ।
নিত-নিত রহে প্রসন্ন যাহাঁ দম্পতি কিশোর বর ॥
যাহাঁ হরি তহাঁ হরিবংশ যাহাঁ হরিবংশ তহাঁ হরি ।
এক শব্দ হরিবংশ নাম রাখ্যৌ সমীপ করি ॥
হরিবংশ নাম সু প্রসন্ন হরি, হরি প্রসন্ন হরিবংশ রতি ।
হরিবংশ চরন সেবক জিতে শুনহু রসিক রস-রীতি গতি ॥১৫॥
Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - যে উপাসক নিত্যনিরন্তর শ্রীহরিবংশ নাম জপ করে, সে সদা প্রফুল্লচিত্তে সেই স্থানে বাস করে, যেখানে নবলকিশোর দম্পতি শ্রীরাধালাল প্রেমক্রীড়ায় লীলা করেন। কারণ যেখানে শ্রীহরি আছেন, সেখানেই শ্রীহরিবংশ, আর যেখানে শ্রীহরিবংশ আছেন, সেখানেই শ্রীহরি। তাই আমি একমাত্র শ্রীহরিবংশ নামরূপ এই শব্দটিকেই আপন করে নিয়েছি। শ্রীহরি শ্রীহরিবংশ নাম শুনে অত্যন্ত প্রসন্ন হন, আর যখন শ্রীহরি প্রসন্ন হন তখন শ্রীহরিবংশে প্রেম জাগে। সেবকজি বলেন—হে শ্রীহরিবংশচরণাশ্রিত সমস্ত রসিকগণ! রসরীতির এই গতি বোঝো।

! জয় জয় শ্রীহিত ধর্মিন-কৃত প্রকরণ কী জয় জয় শ্রীহিত হরিবংশ !
৭. শ্রীহিত রস-রীতি
ব্যাস নন্দন জগত-আধার ।
জগমগত জগজস, সব জগ বন্দনীয়, জগভয় - বিহণ্ডন ।
জগ - শোভা, জগ-সম্পদা, জগ-জীবন, সবজগ-মণ্ডন ॥
জগ- মঙ্গল, জগ-উদ্ধারণ, জগ-নিধি, জগত- প্রসংশ ।
চরণ-শরণ সেবক সদা, সু জয় জয় শ্রীহরিবংশ ॥১॥
Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - ব্যাস মিশ্রজির পুত্র শ্রীহরিবংশচন্দ্রজু সমগ্র জগতের আশ্রয়। তাঁর যশ জগতে দীপ্তিমান, তিনি সর্বজনের বন্দনীয় ও ভয়নাশক। তিনি জগতের শোভা, ঐশ্বর্য, জীবন ও ভূষণ। তিনি জগতের মঙ্গলকারী, উদ্ধারকর্তা, সর্বস্বনিধি ও জগতের দ্বারা প্রশংসিত। আমি সেবক সেই শ্রীহরিবংশচন্দ্রজুর শরণাগত, তাঁর জয়জয়কার হোক।

জয়তি যমুনা বিমল - বর-বারি ।
শীতল তরল তরঙ্গিনী, রত্ন-বদ্ধ বিবি তট বিরাজত ।
প্রফুলিত বিবিধ সরোজগণ, চক্রবাদি কল হংস রাজত ॥
কূল বিশদ, বনদ্রুম সঘন, লতা - ভবন অতিরম্য ।
নিত্য-কেলি হরিবংশ হিত, সু ব্রহ্মাদিকন অগম্য ॥২॥
Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - আমি সেই যমুনাজির জয়জয়কার করি, যাঁর নির্মল জলে শীতল ও চঞ্চল তরঙ্গ নিত্যই দোল খায়, রত্নখচিত তটে শোভা বিরাজে, নানাবিধ কমল প্রস্ফুটিত, জলকুক্কুট, সারস, হংস, কলহংস ও রাজহংসে মনোরম। যাঁর বিস্তীর্ণ তীরে সঘন বৃক্ষবলী ও লতাভবন সুশোভিত, যেখানে ব্রহ্মাদির অগম্য শ্রীহরিবংশের নিত্য প্রেমকেলি অনবরত বিরাজমান।

সুঘর সুন্দর সুমতি সর্বজ্ঞ ।
সন্তত সহজ সদা সদন, সঘন কুঞ্জ সুখ- পুঞ্জ বর্ষত ।
সৌরভ সরস সুমন চৈন, সাজ্জিত সাইন সচু রং হার্ষত ॥
কেলি বিশদ আনন্দ রসদ, বেলি বঢ়ত নিত্য যাম ।
ঠেলি নিগম-মগ পগ সুভগ, খেলি কুঁবর-বর বাম ॥৩॥
Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - এই রসরূপ যুগল চতুরতার শিরোমণি, অতুল সুন্দর, মনোহর মতি-সম্পন্ন ও সর্বজ্ঞ—সঙ্গীত ও শ্রৃঙ্গার রসের সকল কলার অধিকারী। তাঁরা সঘন কুঞ্জরূপ নিত্য মন্দিরে স্বভাবতই অনন্ত সুখবর্ষণ করেন। সেখানে সুরভিত ফুল বেছে শয্যা সাজিয়ে তার আনন্দরঙ্গে মুগ্ধ হন। এই রসযুগলের আনন্দময় রসরাঙিন শ্রৃঙ্গার কেলিলতা প্রতি মুহূর্তে বৃদ্ধি পায়, আর মনোরম কিশোর শ্রীশ্যামঘন ও শ্রেষ্ঠ বামা শ্রীবৃষভানুনন্দিনী নিগমমার্গ তথা ত্রিগুণপথকে পদকমলে ঠেলিয়া আনন্দক্রীড়া করেন।

রসিক রমনী রসদ রস - রাশি ।
রস-সিংবা, রস- সাগরী, রস নিকুঞ্জ রসপুঞ্জ বর্ষত ।
রসনিধি সুবিধি রসজ্ঞ, রস রেখ রীতি-রস প্রীতি হার্ষত ॥
রস মুরতি, সূরতি সরস, রস বিলসন রস রং ।
রস প্রবাহ সরিতা সরস, রতি রস লহর তরঙ্গ ॥৪॥
Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - এই রসরূপ মূর্তি রসিক, অর্থাৎ রসাস্বাদে পরিপূর্ণ; সে রমণীয়, রসদাত্রী ও রসরাশির আধার। সে রসের সীমা, রসসমুদ্র, রসনিকুঞ্জে রসধারার বর্ষণকারী। সে রসনিধি, পরম রসজ্ঞা, রসরীতির রেখা—অর্থাৎ রসের চূড়ান্ত সীমা—এবং প্রীতিতে হর্ষিত। এই রসমূর্তির সুরত রসে পূর্ণ, তার রসভিলাস রসরঙে রঞ্জিত, আর সেই বিলাস থেকে যে রসপ্রবাহ উৎসারিত হয়, তা প্রেমরসের তরঙ্গিত এক পরিপূর্ণ সরিতার ন্যায়।

শ্যাম সুন্দর উরসি বনমাল ।
উরগভোগ ভুজদণ্ড বর, কম্বুকণ্ঠ মণি-গণ বিরাজত ।
কুঞ্চিত কচ মুখ তামরাস, মধু-লম্পট জনু মধুপ রাজত ॥
শীর্ষ মুকুট, কুণ্ডল শ্রবণ, মুরলী অধর ত্রিভঙ্গ ।
কনক- কাপিস পট শোভিয়ত জনু ঘন - দামিনি সঙ ॥৫॥
Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - শ্যামসুন্দর হৃদয়ে বনমালা ধারণ করেছেন; তাঁর সুদৃঢ় বাহুদণ্ড স্ফীত নাগদেহের ন্যায় মনোহর। শঙ্খসম কণ্ঠে মণিমাল্য, কণ্ঠশ্রী ও কৌস্তুভমণি জ্বলজ্বল করছে। কমলসম মুখে ঘন ঘুঙুরে কেশ এমন শোভা পাচ্ছে যেন পরাগলোভী ভ্রমর কমলে আসন নিয়েছে। শিরে মুকুট, কর্ণে কুন্ডল ও অধরে মুরলী ধারণ করে তিনি ললিত ত্রিভঙ্গদেহে অপরূপ শোভা দিচ্ছেন। তাঁর শ্যাম অঙ্গে সোনার মতো দীপ্ত পীতাম্বর এমন দেখায় যেন দামিনির সঙ্গে মেঘ মিলিত হয়েছে।

সুভগ সুন্দরী, সহজ সিংগার ।
সহজ শোভা সর্বাঙ্গ প্রতি, সহজ রূপ বৃ্ষভানু নন্দিনী ।
সহজআনন্দ কদম্বিনী, সহজ বিপিন বর উদিত চন্দিনী ॥
সহজ কেলি নিত-নিত নবল, সহজ রং সুখ চৈন ।
সহজ মাধুরি অঙ্গ প্রতি, সু মোপৈ কহৎ বনেই ন॥৬॥
Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - স্বভাবতই বৃষভানুনন্দিনী পরম সৌভাগ্যবতী সুন্দরী; স্বভাবতই তিনি আপন প্রিয়তম শ্যামঘনকে নিজের বশে রেখেছেন এবং তাঁর অনন্য, পূর্ণ প্রেম স্বতঃস্ফূর্তভাবে পেয়েছেন। তাঁর সর্বাঙ্গে প্রেমের সহজ শোভা বিকশিত, তাঁর অলঙ্কারও সহজ—অর্থাৎ অলঙ্কারবিহীন দেহই অলঙ্কৃত। তিনি স্বভাবানন্দবর্ষিণী মেঘমালা, যিনি আশ্রিতদের উপর অনায়াসে আনন্দের বর্ষা করেন। স্বভাবপ্রেমের শ্রেষ্ঠ রূপ বৃন্দাবনবিপিনরাজে তিনি নিত্য উদিত চন্দ্রিকা, যিনি প্রেমপ্রভায় তাকে আলোকিত করেন। প্রিয়তমের সঙ্গে তাঁর প্রেমকেলি নিত্য নবরূপে স্বাভাবিকভাবে সংঘটিত হয়, এবং তাতে আনন্দ ও উল্লাস সহজরূপে বিরাজ করে। বৃষভানুনন্দিনীর প্রতিটি অঙ্গে এমন এক অপরূপ স্বাভাবিক মাধুর্য ভরা, যার বর্ণনা করা আমার পক্ষে সম্পূর্ণ অসম্ভব।

বিপিন নৃতত রসিক রস- রাশি ।
দম্পতি অতি আনন্দ বস, প্রেম মত্ত নিস্শঙ্ক ক্রীড়ত ।
চঞ্চল কুণ্ডল কর চরণ, নৈন লোল রতি রং ব্রীড়ত ॥
ঝটকত পট, চুটকিন চটক, লটকত লট, মৃদু হাস ।
পটকত পদ, উঘটত শব্দ, মটকত ভৃকুটি - বিলাস ॥৭॥
Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - রসরাশি ও রসাস্বাদে নিমগ্ন যুগল রাধা-শ্যামঘন বৃন্দাবনে পরম আনন্দে উন্মত্ত হয়ে নৃত্য করছেন; প্রেমমত্ততায় স্বভাবতই নির্ভীক হয়ে তাঁরা রাসক্রীড়ায় মগ্ন। যুগলের কুন্ডল, করকমল ও চরণকমল নৃত্যের গতি ও অভিনয়ে চঞ্চল হয়ে উঠেছে; প্রিয়ার চঞ্চল নয়ন রতিলীলার রঙে লজ্জায় নত। রাসের মধ্যভাগে প্রিয়তমকে রসভরে অসাবধান হতে দেখে প্রিয়া তাঁর পীতাম্বর ঝটকা দিয়ে টেনে দেন ও চুটকি বাজিয়ে সতর্ক করার চেষ্টা করেন। এই ক্রিয়ার সময় তাঁর মৃদু হাসিযুক্ত মুখে কেশের এক কোমল লট ভেসে পড়েছে। নৃত্যের তালে প্রিয়া পদাঘাতে মাটিতে আঘাত করছেন, নূপুর শব্দিত হচ্ছে, ‘থেই-থেই’ প্রভৃতি ধ্বনি উচ্চারিত হচ্ছে, আর তাঁর বাঁকা ভ্রুর লীলাময় গতি অপরূপ শোভা ছড়াচ্ছে।
নব-নব বন ঘন ক্রীড়ন্ত, নব নিকুঞ্জ বিলসন্ত সর্বস।
নব-নব রতি নিত-নিত বঢ়ত, নয়ৌ নেহ নব রং নয়ৌ রস ॥
নব বিলাস কল হাস নব, সরস মধুর মৃদু বৈন ।
নব কিশোর হরিবংশ হিত, সু নবল নবল সুখ চৈন ॥৮॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - নবীন নাগরী শ্রী বৃষভানুনন্দিনী ও নবীন যুবরাজ শ্রী শ্যামঘন নিত্য নবীন সঘন বনে ক্রীড়ায় মগ্ন, এবং শ্রীবৃন্দাবনের নবীন নিকুঞ্জে পরস্পরের হৃদয়ে সঞ্চিত আশ্চর্য প্রেমসম্পদের পূর্ণ ভোগ করছেন। এই দুইজনের নিত্য নবীন রতি সর্বদা বৃদ্ধি পায়, তাঁদের নবীন স্নেহে নব নব রঙ ও নব নব রস উদ্ভাসিত হয়। তাঁদের ক্রীড়াবিলাসে সদা নবীন হাস্য-পরিহাস ও মধুর কোমল রসরঞ্জিত বাক্যধারা প্রবাহিত হয়। হিতস্বরূপ শ্রী হরিবংশচন্দ্রের এই নবকিশোর যুগলের প্রেমবিলাসে সদা নব নব সুখচৈতন্য বিকশিত হয়।

নবল নবল সুখ চৈন, অ্যাইন আপনেআপু বস ।
নিগম লোক মর্যাদ, ভঞ্জি ক্রীড়ন্ত রং রস ॥
সুরত-প্রসঙ্গ নিস্শঙ্ক করত জোই-জোই ভাবত মন ।
ললিত অঙ্গ চলি ভঙ্গি- ভাই লজ্জিত সু কোক গণ ॥
অদ্ভুত বিহার হরিবংশ হিত, নিরখি দাসি সেবক জিতয়ত ।
বিস্তরত, শুনত, গাবত রসিক, শুনিত-নিত লীলা-রস পীয়ত ॥৯॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - শ্রী শ্যামাশ্যামের অনাদি–অনন্ত প্রেমবিলাসে সদা নব নব সুখচৈতন্য প্রকাশিত হয়, এবং সেই বিলাসে প্রেমের রূপও অত্যন্ত আশ্চর্য। এই প্রেমরূপের বৈশিষ্ট্য এই যে, সাধারণ প্রেমের ন্যায় উভয় প্রেমী একে অপরের অধীন নন। জগতে যে প্রেমে পরস্পর অধীনতা দেখা যায়, তা কামাশ্রিত হয়; কিন্তু সর্বথা কামগন্ধশূন্য প্রেমে প্রেমীর অধীনতা স্বাভাবিক, সে প্রীতি প্রেমপাত্রের অনুগামী নয়, বরং নিজের প্রীতির অনুগামী। এই অবস্থাকেই সেবকজি বলেছেন — ‘ঐন আপনৈ আপ বশ’ অর্থাৎ সম্পূর্ণ নিজের প্রীতির পরবশ। অতএব শ্রী শ্যামাশ্যাম উভয়ে ‘ঐন’ — অর্থাৎ সম্পূর্ণভাবে নিজের প্রীতিরই অধীন, একে অপরের প্রীতির নয়। তাঁরা বেদের ও লোকের মর্যাদার সীমা ভেঙে, ত্রিগুণের গণ্ডির বাইরে থেকে, রসোল্লাসে পূর্ণ প্রেমক্রীড়ায় সদা মত্ত। তাঁরা স্বরুচি অনুসারে নানা প্রেমকেলি নির্ভয়ে করেন, যাঁহাতে তাঁদের কমলমৃদু অঙ্গচালনায় নানাবিধ ভঙ্গিমা উৎপন্ন হয়, যাহা দর্শনে স্বয়ং শৃঙ্গাররসও লজ্জিত হয়। সেবকজি বলেন — শ্রীহরিবংশচন্দ্রজূ-প্রদত্ত এই আশ্চর্য হিতবিহার (প্রেমবিহার) দর্শনে দাস আমি জীবিত থাকি; এই বিলাসই আমার জীবনের আশ্রয়। আর রসিকগণ এই বিহারের কথন, শ্রবণ ও গানে লীলারসের পানে মুহূর্তে মুহূর্তে তৃপ্ত হন।

! জয় জয় শ্রীহিত রস-রীতি প্রকরণ কী জয় জয় শ্রীহিত হরিবংশ !
৮. শ্রীহিত অনন্য টেক
কর্ম-ধর্ম কঊ করহু বেদ-বিধি,
কঊ বহুবিধ দেবতন উপাসী ।
কঊ তীরথ তপ জ্ঞান ধ্যান ব্রত,
অরু কঊ নির্গুণ ব্রহ্ম উপাসী ॥
কঊ যম-নেম করে আপনী রুচি,
কঊ অবতার-কদম্ব উপাসী ।
মন-ক্রম-বচন ত্রিশুদ্ধ সকল মত,
হম শ্রীহিত হরিবংশ উপাসী ॥১॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - কেউ যদি বেদ অনুযায়ী কর্ম-ধর্ম পালন করে বা দেবদেবীদের উপাসনা করে বা তীর্থযাত্রা, তপস্যা, জ্ঞান, ধ্যান ও উপবাস পালন করে বা কেউ নির্গুণ ব্রহ্মের উপাসনা করে বা নিজের ইচ্ছামত নিয়মকানুন মেনে চলে বা বিভিন্ন অবতারের উপাসনা করে, তবে সে আনন্দে করুক। (আমাদের তার সঙ্গে কোনো ঝগড়া নেই) আমাদের কথা হলো, আমরা মন, বাণী ও কর্মে অনন্য হয়ে শ্রীহিত হরিবংশচন্দ্রজুর উপাসক।
জাতি পाँতি কুল-কর্ম-ধর্ম ব্রত,
সন্সৃতি-হেতু অবিদ্যা নাসী ।
সেবক- রীতি প্রতীতি প্রীতি হিত,
বিধি-নিষেধ শৃঙ্খলা বিনাসী ॥
অব জোই কহী করে হম সোই,
আয়সু লিয়ে চলে নিজ দাসী ।
মন-ক্রম-বচন ত্রিশুদ্ধ সকল মত,
হম শ্রীহিত হরিবংশ উপাসী ॥২॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - সেবকজি বলেন যে, সংসারে জন্ম-মরণের কারণ হয়ে যাওয়া অর্থাৎ মানুষের বারবার জন্ম-মরণ ঘটানোকারী অজ্ঞানিরূপ জাতি-পঁচি, কুল ধর্ম-কর্ম ও উপবাস আমি ত্যাগ করেছি। শ্রীশ্যামাশ্যমের প্রতি শ্রীহিতজু মহারাজের যে প্রেম আছে, সেটি ধরে রাখা আমার ভজনের রীতি, এবং এর জন্য আমি বিধি-নিষিদ্ধের শৃঙ্খল ভেঙে দিয়েছি। এখন আমার একমাত্র সহজ কর্তব্য হলো শ্রীহিতজু মহারাজ যা আজ্ঞা দেবেন তা পালন করা, কারণ সহজ দাসীর কর্তব্য হলো শুধুই স্বামীর আজ্ঞাবর্তী হওয়া। এই ধরনের দৃঢ় সংকল্পের বুদ্ধি নিয়ে এবং মন-কর্ম-উক্তি একে অপরের সাথে সামঞ্জস্য রেখে আমরা শ্রীহরিবংশের উপাসক।

যো হরিবংশ কউ নাম সুনাবৈ,
তন-মন-প্রাণ তাসু বলিহারি ।
যো হরিবংশ-উপাসক সেবৈ,
সদা সেউঁ তাকে চরন বিচারি ॥
যো হরিবংশ-গিরা জস গাবৈ,
সর্বসু দেঁহুঁ তাসু পর বারী ।
যো হরিবংশ কউ ধর্ম সিখাবৈ,
সোই তৌ মেরে প্রভু তেঁ প্রভু ভারি ॥৩॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - যে আমাকে শ্রীহরিবংশ নাম শুনায়, তার প্রতি আমি আমার তন-মন-প্রাণ উৎসর্গ করি, যে শ্রীহরিবংশের উপাসকের সেবা করে আমি তার পদসেবা করি, এবং যে শ্রীহরিবংশের বাণীর অতুলনীয় গুণের কীর্তি গায়, তার প্রতি আমি আমার সমস্ত স্বত্ব উৎসর্গ করতে প্রস্তুত। যে আমাকে শ্রীহরিবংশের ধর্ম শিক্ষা দেয়, তাকে আমি আমার প্রভু শ্রীহরিবংশ থেকেও বেশি মান দিই।

শ্রীহরিবংশ সু নাদ বিমোহीं,
সুনি ধুনি নিত্য তহাঁ মন দেহুঁ ।
শ্রীহরিবংশ শুনন্ত চলीं সঙ,
হ্রৌঁ তিন সঙ নিত্য প্রতি জেহুঁ ।
শ্রীহরিবংশ বিলাস রাস- রস,
শ্রীহরিবংশ সঙ অনুভেহুঁ ।
যো হরি নাম জগত্ৰি শিরোমণি,
বংশ বিনা কভহুঁ নহিঁ লেহুঁ ॥৪॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - শ্রীহরিবংশের সুন্দর (প্রেমময়) নাদে বিশেষভাবে মোহিত হয়ে, আমি এই ধ্বনি শুনে প্রতিদিন মনযোগ দেব এবং শ্রীহরিবংশজুর বাঁশি শুনে যে তার সঙ্গে চলে, আমি প্রতিদিন তার সঙ্গে চলব। শ্রীহরিবংশের রাস-বিলাসের রস আমি শ্রীহরিবংশজুর সঙ্গে থেকে অনুভব করব, এবং এজন্য 'হরি' নাম, যা তিনিও লোকের মধ্যে শিরোমণি মনে করা হয়, তা উচ্চারণ আমি কখনো তার সঙ্গে 'বংশ' লাগিয়ে করব না।

প্রেমী অনন্য ভজন্ন ন হুই,
যো অন্তরজামী ভজৈ মন মেঁ ।
যো ভজি দেখ্যৌ যশোদা কউ নন্দন,
বিশ্ব দিখাই সবৈ তন মেঁ ॥
শ্রীহরিবংশ সু নাদ বিমোহीं তে,
শুদ্ধ সমীপ মিলीं ছিন মেঁ ।
অব ইয়ামে মিলৌনী মিলৈ ন কছূ,
যব খেলত রাস সদা বন মেঁ ॥৫॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা – সেবকজি বলেন যে অনন্য প্রেমীদের ভজন হৃদয়ের অন্তর্গত অন্তর্যামী তত্ত্বকে ভজনের মাধ্যমে হয় না। সেবকজির এই কথা শুনে কেউ যদি বলেন, আপনার উপাসনায় যদি ভগবানের প্রতিভূরূপ গ্রহন করতে চান, তবে যশোদানন্দনের ভজন-চিন্তন করুন, তার উত্তরে সেবকজি বলেন, যারা যশোদানন্দনকে ভজ্যেছেন, তারা তাকে নিজের মুখে সমগ্র বিশ্বের দর্শন করাতে দেখেছেন। যে ব্রজাঙ্গনাগুলি শ্রীহরির বংশীনাদে বিমোহিত হয়েছিল, তারা এক ক্ষণেই শুদ্ধ প্রেমের পথে বংশীনাদের মূল সূত্র রস-স্বরূপ শ্রীহরির কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। এখন, অর্থাৎ কলিয়ুগে শ্রীহরিবংশের নাদ বা বাণীর মাধ্যমে যে রসলীলা প্রবর্তিত হয়েছে, তাতে কোনো মিশ্রণের সুযোগ নেই, কারণ এই রস শ্রীবৃন্দাবনে অনাদি-অনন্ত রূপে চিরকাল অখণ্ডিত চলে, এবং রসিক উপাসকদের জন্য এ অভিজ্ঞতাও অখণ্ডিত ধারার মতো হয়।

যো বহু মান করৈ কউ মেরৌ,
কিয়ে বহু মানত নাহিঁ বড়াই ।
যো আপমান করৈ কউ কৈহूँ,
কিয়ে আপমান নহিঁ লঘুতাই ॥
শ্রীহরিবংশ - গিরা রস সাগর,
মাঁঝ মগন্ন সবৈ নিধি পাই।
যো হরিবংশ তজৌঁ, ভজৌঁ অরহিঁ,
তৌ মোহি শ্রীহরিবংশ দুহাই ॥৬॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - যদি কেউ আমাকে খুব সম্মান করে, তাতে আমি নিজেকে বেশি বড় মনে করি না, আর যারা আমার অপমান করে, তাতে আমি ছোট হয়ে যাই না। শ্রীহরিবংশের বাণীতে যে রসের সাগর ঢেউ খেলছে, তাতে আমার মন নিমগ্ন হয়েছে এবং তাতে আমি পূর্ণ সুখের সম্পূর্ণ ধন পেয়েছি। অতএব, যাঁর প্রতি শ্রীহরিবংশচন্দ্রজুর কৃপায় এই সুখ-সমৃদ্ধি আমি পেয়েছি, তাঁকে ছাড়া যদি আমি অন্যের ভজন করি, তবে তা তাদের শপথ অনুযায়ী হবে।

কহি বন-কেলি নিকুঞ্জ-নিকুঞ্জন,
নব দল নূতন সেজ রচাই।
নাথ বিরমি-বিরমি কহি তব,
সো রতি বৈসি ধৌ ক্যাসে ভুলাই ॥
সত্বর উঠে মহামধু পীবত,
মাধুরি বানি মেরে মন ভাই।
যো হরিবংশ তজৌঁ, ভজৌঁ অরহিঁ,
তৌ মোহি শ্রীহরিবংশ দুহাই ॥৭॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - যেসব স্থানে নতুন কাণ্ডের (কিশলয়ের) মাধ্যমে নতুন শয্যা তৈরি হয়েছে, সেই বিভিন্ন নিকুঞ্জের শৃঙ্গার কেলির বর্ণনা, যেটি তাঁদের বাণীতে 'বনের কুঞ্জন কুঞ্জন ডলন' (পদ ৩৪) ও 'নাগরী নিকুঞ্জ অ্যন কিশলয় দল রচিত শৈন' (পদ ৭৬)-এ আছে, এবং সেই পদ ৭৬-এর পঙক্তি 'মুখর নূপুরন সুবাভ কিঙ্কিনী বিচিত্র রাও বিরমি-বিরমি নাথ বাদত বর বিহার রী'-তে শ্রীশ্যামঘন উন্মাদ বিহারের কারণে শ্রীপ্রিয়াজুকে ক্লান্ত দেখে বলেন, “হে প্রিয়া জু, শ্রেষ্ঠ বিহার হয়েছে, এখন বিশ্রাম করো।” প্রিয়তমার প্রতি শ্রীশ্যামঘনের এই শব্দ থেকে প্রকাশিত অনন্য রতি কীভাবে ভুলে যাওয়া সম্ভব? এই অসাধারণ রস-মাধুর্যের বর্ণনা করা শ্রীহিতজু মহারাজের মধুর বাণী আমার মনকে অত্যন্ত প্রিয়। সেবকজি বলেন, যারা এই অসাধারণ রতি ও অনুপম মাধুর্যের গভীর বর্ণনা করেছেন, সেই শ্রীহরিবংশকে ছাড়া আমি অন্যের ভজন করলে, তা শ্রীহরিবংশের শপথ অনুযায়ী হবে।

ভুজ অংসন দীনে বিলোকি রহে,
মুখ-চন্দ্র উভয় মধু পান করাই।
আপু বিলোকি হৃদয় কিয়ৌ মান,
চিবুক্ক সুচারু প্রলোড় মনাই ॥
শ্রীহরিবংশ বিনা ইহ হেতু,
কো জানে কহা, কো কহৈ সমুজাই।
যো হরিবংশ তজৌঁ , ভজৌঁ অরহিঁ,
তৌ মোহি শ্রীহরিবংশ দুহাই ॥৮॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - দম্পতি শ্রীশ্যামাশ্যম সম্পূর্ণ রাত প্রেম-বিহারে কাটানোর পর প্রভাতকালে শ্রীবৃন্দাবনের নিকুঞ্জ মন্দিরে কিশলয় শয্যায় অবস্থান করছেন। তারা পরস্পরের কাঁধে বাহু রেখেছেন এবং অচল নয়নে একে অপরের মুখচন্দ্র থেকে ঝরিত অমৃতের স্বাদ চকোরের মতো গ্রহণ করছেন। শ্রীহরির হৃদয়দर्पণে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে শ্রীরাধা বিভ্রান্ত হন এবং তা অন্য কোনো রমণীর প্রতিবিম্ব মনে করে গ্রহণ করেন। শ্রীশ্যামসুন্দর তাঁর অপ্রত্যাশিত মান দেখে প্রিয়তমার সুন্দর চিবুক সহলে তাঁকে মনানোর চেষ্টা করেন। শ্রীহরিবংশ ছাড়া এই অসাধারণ প্রেমের সম্পর্ক কেউ কী জানতে বা কী বলতে পারে? এই অসাধারণ প্রেমসিদ্ধান্তের জ্ঞান প্রদানকারী শ্রীহরিবংশচন্দ্রজু ছাড়া যদি আমি অন্য কারো ভজন করি, তা শ্রীহরিবংশের শপথ অনুযায়ী হবে।

শ্রীহরিবংশ শুনাদ, সুরীতি,
সুগান মিলৈ বন - মাধুরী গাই।
শ্রীহরিবংশ বচন্ন রচন্ন,
সু নিত্য কিশোর-কিশোরী লড়াই॥
শ্রীহরিবংশ গিরা রস রীতি,
সু চিত্ত প্রতীতি ন আন সুহাই।
জো হরিবংশ তজৌঁ, ভজৌঁ অরহিঁ,
তৌ মোহি শ্রীহরিবংশ দুহাই॥ ৯॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - শ্রীহরিবংশচন্দ্রজু তাঁর বাণীতে সুন্দর নাদ, সুন্দর রীতি ও সুন্দর গান মিশিয়ে শ্রীবৃন্দাবনের মাধুর্য গেয়েছেন। শ্রীহরিবংশচন্দ্রজু তাঁর বচনে, অর্থাৎ বাণীতে, চিরকিশোর ও চিরকিশোরীকে লाड़ লড়িয়েছেন। সেবকজি বলেন, শ্রীহরিবংশের বাণীতে বর্ণিত রস-রীতিই আমার মনে বিশ্বাসযোগ্য, অন্য রস-রীতি আমাকে প্রিয় নয়। এজন্য আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, শ্রীহরিবংশকে ছাড়া যদি আমি অন্য কারো ভজন করি, তা শ্রীহরিবংশের শপথ অনুযায়ী হবে।

শ্রীহরিবংশ কউ নাম সুচু সর্বসু,
জানি সুড়াখ্যৌ ম্যাঁ চিত্ত সমাই।
শ্রীহরিবংশ কে নাম-প্রতাপ কউ,
লাভ লহ্যৌ সুড়খ্যৌ নহিঁ জাই ॥
শ্রীহরিবংশ কৃপা তেঁ ত্রিশুদ্ধ কই,
সাঁচী এটি যু মেরেঁ মন ভাই।
যো হরিবংশ তজৌঁ, ভজৌঁ অরহিঁ,
তৌ মোহি শ্রীহরিবংশ দুহাই ॥10॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - আমি শ্রীহরিবংশচন্দ্রজুর নামকে আমার সর্বস্ব মনে করে তা চিত্তে সম্পূর্ণভাবে স্থান দিয়েছি। শ্রীহরিবংশচন্দ্রজুর নাম-প্রতাপের যে লাভ আমার হয়েছে, তা বর্ণনা করতে আমি অক্ষম। শ্রীহরিবংশের কৃপায় মন, বাণী ও কর্মের শুদ্ধতা সহকারে, এই সম্পূর্ণ রূপই আমার মনকে প্রিয় হয়েছে যে, শ্রীহরিবংশচন্দ্রজু ছাড়া যদি আমি অন্য কারো ভজন করি, তা শপথে শ্রীহরিবংশেরই হবে।

দেখে জুমৈঁ অবতার সবৈ ভজি,
তহাঁ-তহাঁ মন তেইসৌ ন জাই।
গোকুলনাথ মহা ব্রজ বৈভব,
লীলা অনেক ন চিত্ত খটাই ॥
একহি রীতি-প্রতীতি বাঁধ্যৌ মন,
মোহি সবৈ হরিবংশ বাজাই।
যো হরিবংশ তজৌঁ, ভজৌঁ অরহিঁ,
তৌ মোহি শ্রীহরিবংশ দুহাই ॥১১॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - সব অবতারের ভজন দেখেছি, কিন্তু তাদের মধ্যে আমার মন সেইভাবে স্থির হয়নি যেমন শ্রীহরিবংশচন্দ্রজু দ্বারা প্রতিষ্ঠিত রস-রীতিতে হয়। শ্রীগোকুলনাথের ব্রজ বৈভব মহান হলেও, সেখানে লীলার বহুলতার কারণে আমার মন তত আকৃষ্ট হয় না। আমার মন একটি মাত্র রীতি (রসলীলা) অনুযায়ী বাঁধা, যেখানে শ্রীহরি বংশীনাদের মাধ্যমে সকলের মন মোহিত করেছিলেন। শ্রীহরিবংশচন্দ্রজু ছাড়া যদি আমি অন্য কারো ভজন করি, তা তাদের শপথ অনুযায়ী হবে।

নাম অর্ধ্ব হারৈ অঘ পুঞ্জ,
জগত্ত করে হরি নাম বড়াই ।
সো হরিবংশ সমেত সম্পূর্ণ,
প্রেমী অনন্যনি কউঁ সুখদাই ॥
শ্রীহরিবংশ কহঁত শুনঁত,
ছিন ছিন কাল বৃথা নহিঁ জাই ।
যো হরিবংশ তজৌঁ, ভজৌঁ অরহিঁ,
তৌ মোহি শ্রীহরিবংশ দুহাই ॥১২॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - শ্রীহরিবংশ নামের অর্ধেক শ্রীহরিনামের পাপসমূহকে হারান করে, এজন্য সারা জগৎ শ্রীহরির নামের মহিমা করে। সেই হরিনাম 'বংশ' (বাঁশী) সঙ্গে মিলিত হয়ে সম্পূর্ণ প্রেম-রূপে রূপান্তরিত হয় এবং এর ফলে (রসের উদ্দীপনা সৃষ্টি হওয়ায়) অনন্য প্রেমীরা সুখ পেতে শুরু করে। তাই অনন্য প্রেমীরা শ্রীহরিবংশ-নামের শুনানি ও চর্চা করে এবং তাদের জীবনের কোনো মুহূর্ত ব্যর্থ যায় না। শ্রীহরিবংশকে ছাড়া যদি আমি অন্য কারো ভজন করি, তা শ্রীহরিবংশের শপথ অনুযায়ী হবে।

শ্রীহরিবংশ সুপ্রাণ, সু মন হরিবংশ গণিজ্জৈ।
শ্রীহরিবংশ সুচিত্ত, মিত্ত হরিবংশ ভনিজ্জৈ ॥
শ্রীহরিবংশ সুবুদ্ধি বরন হরিবংশ নাম জস।
শ্রীহরিবংশ প্রকাশ বচন হরিবংশ গিরা রস ॥
হরিবংশ নাম বিসরৈ ন ছিন, শ্রীহরিবংশ সহায় ভল।
হরিবংশ চরন সেবক সদা, সু শপথ করি হরিবংশ বল ॥১৩॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - সেবকজি বলেন, শ্রীহরিবংশকেই আমার সুন্দর প্রাণ ও সুন্দর মন মনে করা উচিত এবং শ্রীহরিবংশকেই আমার সুন্দর চিত্ত ও তাতে বাস করা পরম বন্ধু বলা উচিত। শ্রীহরিবংশই আমার সুন্দর বুদ্ধি, এবং সেই বুদ্ধির দ্বারা আমি শ্রীহরিবংশের নাম ও যশের বর্ণনা করি, সেটাও শ্রীহরিবংশই। আমার বচনে প্রকাশ বা চমৎকারি শ্রীহরিবংশ, এবং আমার বাণী থেকে যে রস সৃষ্টি হয়, তাও শ্রীহরিবংশই। এইভাবে শ্রীহরিবংশ আমার সম্পূর্ণ সহায়ক হওয়ায় শ্রীহরিবংশের নাম আমি এক মুহূর্তও ভুলি না। শ্রীহরিবংশপদে নিয়মিত সেবক শ্রীহরিবংশের শক্তিতে এই ছন্দগুলিতে শপথ নিয়েছেন।

! জয় জয় শ্রীহিত অনন্য টেক প্রকরণ কী জয় জয় শ্রীহিত হরিবংশ !
৯. শ্রীহিত অক্রিপা কৃপা

শ্রীহিত অকৃপা সোরঠা

সব জগ দেখ্যৌ চাই, কাহি কহু হরি ভক্তি বিনু।
প্রীতি কহঁউ নহিঁ আহি, শ্রীহরিবংশ কৃপা বিনা ॥১॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - সেবকজি বলেন, আমি সমগ্র জগতকে ভালভাবে যাচাই করে দেখেছি। আমি এখানে কাকে শ্রীহরির ভক্তি থেকে শূন্য বলব? কিন্তু শ্রীহরিবংশের কৃপা ছাড়া প্রীতি কোথাও দেখা যায় না।

গুপ্ত প্রীতি কউ ভঙ্গ, সঙ প্রচুর অতি দেখিয়ত।
নাহিঁন উপজত রং, শ্রীহরিবংশ কৃপা বিনা ॥২॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - আর যা সাধারণ জীবনের পারস্পরিক প্রীতির কথা, তাতে একে অপরের সঙ্গ যথেষ্ট দেখা যায়, কিন্তু গোপন প্রীতি বা অন্তর্গত প্রীতিতে ব্যাঘাত থাকে। এই ধরনের প্রীতিতে যে আনন্দের রঙ উদ্ভূত হয় না, তার কারণ শ্রীহরিবংশের কৃপার অভাব।

মুখ বরনৎ রস-রীতি, প্রীতি চিত্ত নহিঁ আবহি।
চাহৎ সব জগ কীর্তি, শ্রীহরিবংশ কৃপা বিনা ॥৩॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - এই লোকেরা চিত্তে প্রীতির আলো ছাড়া মুখে রস-রীতির বর্ণনা শুরু করে। কেউ যদি জিজ্ঞেস করে, তারা প্রীতি ছাড়া কীভাবে এত সুগভীর কথা বলতে পারে, তার উত্তরে সেবকজি বলেন, এই লোকদের একমাত্র উদ্দেশ্য তাদের রসিকতার কীর্তি জগতে ছড়িয়ে দেওয়া, এবং তাদের মন ও বাণীতে এই পার্থক্য শ্রীহরিবংশের কৃপা ছাড়া ঘটে।

গাবত গীত রসাল, ভাল তিলক শোভিত ঘনা।
বিনু প্রীতিহিঁ বেহাল, শ্রীহরিবংশ-কৃপা বিনা ॥৪॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - কিছু ভক্ত তাদের ললাটে মোটা মোটা তিলক করে রসপূর্ণ গান গায়, কিন্তু প্রীতি ছাড়া অস্থির ও দুঃখিত থাকে। তাদের এই অবস্থা শ্রীহরিবংশের কৃপা ছাড়া হয়।

নাচত অতিহি রসাল, তাল ন শোভিত প্রীতি বিনু।
জনু বীন্ধে জঞ্জাল, শ্রীহরিবংশ-কৃপা বিনা ॥৫॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - কিছু মানুষ অত্যন্ত সুন্দর নৃত্য করে, কিন্তু তাদের স্বর-তাল প্রীতি ছাড়া সৌন্দর্য পায় না। নৃত্য করতে করতে তাদের অঙ্গভঙ্গি দেখে মনে হয় যেন তারা কাঁটাযুক্ত জঞ্জালে ফেঁসেছে এবং দুঃখে নিজেদের অঙ্গ মরোচ্ছে। তাদের এই অবস্থা শ্রীহরিবংশের কৃপা ছাড়া ঘটে।

মানত আপনোঁ ভাগ, রাগ করে অনুরাগ বিনু।
দিখত সকল অভাগ, শ্রীহরিবংশ-কৃপা বিনা ॥৬॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - যারা রাগ অর্থাৎ রঙের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের চিত্র সৃষ্টি করে এবং তাই নিজেদের ভাগ্যবান মনে করে, কিন্তু তাদের চিত্তে অনুরাগ থাকে না। তাদের সমস্ত চেষ্টা দুর্ভাগ্যের মতোই প্রদর্শিত হয়, এবং এর কারণ শ্রীহরিবংশের কৃপার অভাব।

পঢ়ত জু বেদ-পুরাণ, দান ন শোভিত প্রীতি বিনু।
বীন্ধে অতি অভিমান, শ্রীহরিবংশ কৃপা বিনা ॥৭॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - যারা বেদ ও পুরাণ পড়ে এবং প্রীতি ছাড়া সেগুলি অন্যদেরকে কাহিনী বা বক্তৃতার মাধ্যমে দান করে, তারা কেবল চরম অহংকারে বন্দি, অর্থাৎ তাদের সম্মান ও প্রতিপত্তির জন্যই সব কিছু করছে। এই অবস্থা শ্রীহরিবংশের কৃপা ছাড়া হয়।

দর্শন ভক্ত অনুপ, রূপ ন শোভিত প্রীতি বিনু।
ভরম ভটক্কত ভূপ, শ্রীহরিবংশ-কৃপা বিনা ॥৮॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - কিছু মানুষের দর্শন অনুপম ভক্তদের মতো হলেও, তাদের সেই সুন্দর রূপ প্রীতি ছাড়া সৌন্দর্য দেয় না। এই ধরনের মানুষ (মানুষের বিচারক) রাজাদেরও বিভ্রান্ত করে নিজের পূজা করাতে পারে। নিজের কিছু দেখানোর এই চেষ্টা শ্রীহরিবংশের কৃপা না থাকায় ঘটে।

সুন্দর পরম প্রবীন, লীন ন শোভিত প্রীতি বিনু।
তে সব দিখত দীন, শ্রীহরিবংশ কৃপা বিনা ॥৯॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - কিছু মানুষ সুন্দর আকৃতির সঙ্গে নৃত্য-বাদ্য ইত্যাদি সঙ্গীতকলায় অত্যন্ত দক্ষ। তারা যখন তাদের কলা প্রদর্শন করে, তাতে তাদের তল্লীনতা পুরোপুরি দেখা যায়, কিন্তু প্রীতি ছাড়া সেই তল্লীনতা সৌন্দর্য পায় না। তাদের প্রদর্শন মানুষের মন জয় করার জন্য, আর কেউ যদি অনুগত না হয়, তারা তখন দীন-হীন মনে হয়। এ সব শ্রীহরিবংশের কৃপা না থাকার ফল।

গুণ মানী সংসার, অর সকল গুণ প্রীতি বিনু।
বহুত ধরত সীর ভার, শ্রীহরিবংশ-কৃপা বিনা ॥১০॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - সমগ্র জগত গুণের অহংকারী, অর্থাৎ প্রতিটি মানুষ নিজের মধ্যে বিভিন্ন গুণ বৃদ্ধির চেষ্টা করে এবং তার ব্যক্তিত্বের উন্নতি সেটার মাধ্যমে মেনে নেয়। কিন্তু সমস্ত গুণ থাকা সত্ত্বেও সে নিজের মধ্যে প্রেম-বৃদ্ধির চেষ্টা করে না। তাই তার সেই গুণের অহংকার তার মাথার ভার হয়ে থাকে এবং তার জীবন কেবল তা বহন করতেই কাটে। এই অবস্থা শ্রীহরিবংশের কৃপা ছাড়া হয়।

শ্রীহিত কৃপা সোরঠা

মুখ বরনৎ হরিবংশ, চিত্ত নাম হরিবংশ রতি।
মন সুমিরন হরিবংশ, এহ জু কৃপা হরিবংশ কী ॥১॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - যে উপাসক শ্রীহরিবংশের কৃপা পায়, সে শ্রীহরিবংশ অর্থাৎ প্রেমের বিভিন্ন চরিত্র মুখে বর্ণনা করে। তার চিত্ত সর্বদা শ্রীহরিবংশ নামের রতিতে পূর্ণ থাকে এবং তার মন সর্বদা শ্রীহরিবংশকে স্মরণ করে।

সব জীবন সউঁ প্রীতি, রীতি নিবাহৎ আপনী।
শ্রবণ-কথন প্রতীতি, এহ জু কৃপা হরিবংশ কী ॥২॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - সে সমগ্র জীবের মধ্যে তার প্রভুর দর্শন করে তাদের প্রতি প্রীতি অনুভব করে। কিন্তু তার ভজনের রীতি সে নিজের মতে পালন করে, এবং সেই রীতি হলো শ্রীহরিবংশের নাম ও বাণীর শ্রবণ-চর্চায় অটল বিশ্বাস রাখা।

শত্রু-মিত্র সম জানি, মানি মান-আপমান সম।
দুখ-সুখ লাভ ন হানি, এহ জু কৃপা হরিবংশ কী ॥৩॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - সে শত্রু-মিত্র, সম্মান-অপমান, দুঃখ-সুখ ও লাভ-হানি সবকিছু সমান মনে করে, অর্থাৎ এসবের অনুকূল বা প্রতিকূল হওয়া তার ভজনকে প্রভাবিত করতে পারে না।

নিত এক ধর্মিন সঙ, রং বঢ়ত নিত-নিত সরস।
নিত-নিত প্রেম অভঙ্গ, এহ জু কৃপা হরিবংশ কী ॥৪॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - সে প্রতিদিন একমাত্র শ্রীহরিবংশ-ধর্মের ধর্মীদের সঙ্গে সংস্পর্শ রাখে, যার ফলে তার চিত্তে প্রতিনিয়ত সুগভীর রঙ বৃদ্ধি পায় এবং তাকে প্রতিনিয়ত প্রেমের অবিচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতা হয়।

নিরখত নিত্য বিহার, পুলকিত তন রোমাভলী।
আনন্দ নৈন সুঢার, এহ জু কৃপা হরিবংশ কী ॥৫॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - শ্রীহরিবংশের কৃপাপাত্র উপাসক শ্রীশ্যামাশ্যমের প্রতিদিনের বিহার দর্শন করে, যার ফলে তার দেহে রোমাঞ্চ অনুভূত হয় এবং চোখে আনন্দের অশ্রু ঝরে।

ছিন-ছিন রুদন করন্ত, ছিন গাবত আনন্দ ভরি।
ছিন-ছিন হহর হাসন্ত, এহ জু কৃপা হরিবংশ কী ॥৬॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - সে প্রতিটি মুহূর্তে কাঁদে, প্রতিটি মুহূর্তে আনন্দে ভরে গান করে এবং প্রতিটি মুহূর্তে উল্লাসিত হাসি হাসতে শুরু করে।

ছিন ছিন বিহরত সঙ, ছিন ছিন নিরখত প্রেম ভরি।
ছিন জস কহত অভঙ্গ, এহ জু কৃপা হরিবংশ কী ॥৭॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - সে শ্রীশ্যামাশ্যমের সঙ্গে প্রতিটি মুহূর্তে বিহার করে, অর্থাৎ সেবা উপকরণ নিয়ে শ্রীবৃন্দাবনের ঘন পথসমূহে তাদের সঙ্গে ঘোরে। প্রতিটি মুহূর্তে প্রেমে পূর্ণ হয়ে তাদের দর্শন করে এবং পরের মুহূর্তে শ্রীশ্যামাশ্যমের যশের অবিচ্ছিন্ন বর্ণনা করে।

নিরখত নিত্য কিশোর, নিত্য-নিত্য নব-নব সূরতি।
নিত নিরখত ছবী ভোর, এহ জু কৃপা হরিবংশ কী ॥৮॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - শ্রীহরিবংশের কৃপাপাত্র উপাসক প্রতিদিন নতুন সুন্দর প্রেম (সুরতি) সহ প্রতিদিনের চিরকিশোর শ্রীশ্যামাশ্যমকে দর্শন করে এবং তাঁর অসাধারণ প্রাতঃকালীন সুরতান্ত চিত্রের স্বাদ গ্রহণ করে।

তৃপ্ত ন মানত নৈন, কুঞ্জ রন্ধ্র অবলোকি তন।
এটি সুখ কহত বনৈ ন, এহ জু কৃপা হরিবংশ কী ॥৯॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - শ্রীহরিবংশের কৃপাপাত্র উপাসকের চোখ কুঞ্জের ছিদ্র দিয়ে শ্রীশ্যামাশ্যমের অসাধারণ অঙ্গ দেখেও তৃপ্ত হয় না, অর্থাৎ অঙ্গচিত্রের স্বাদ গ্রহণ করলেও সদা অতৃপ্ত থাকে। সেবকজি বলেন, তাদের এই অতৃপ্ত দর্শন-সুখের বর্ণনা করা সম্ভব নয়।

কহা কহঁত বড় ভাগ, নিত-নিত রতি হরিবংশ হিত।
নিত বর্ধত অনুরাগ, এহ জু কৃপা হরিবংশ কী ॥১০॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - সেবকজি বলেন, শ্রীহরিবংশের কৃপা প্রাপ্ত এই ধরনের উপাসকের শ্রীহরিবংশপদে রতি প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পায় এবং তার অনুরাগও প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পায়। এমন উপাসকের মহাগভীর ভাগ্যের প্রশংসা করার জন্য আমার কাছে শব্দ নেই।

নিত বর্ধত অনুরাগ ভাগ আপনোঁ করে মানত।
নিত্য-নিত্য নব কেলি নিরখি নৈননি সাচু মানত।
নিত-নিত্য শ্রীহরিবংশ নাম নব-নব রতি মানত।
নিত-নিত্য শ্রীহরিবংশ কহঁত সোই-সোই সীর মানত।
আপুন ভাগ আপুন প্রগট, কহঁত জু শ্রীহরিবংশ বল।
হরিবংশ ভরোসে ভয়ে নিডর, সু নিত গরজত হরিবংশ বল ॥১১॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - এই ধরনের উপাসকের অনুরাগ প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পায়, যা সে নিজের পরম ভাগ্য মনে করে, এবং শ্রীশ্যামাশ্যমের প্রতিদিনের নতুন কেলি দেখে তার চোখ পরম সুখ মনে করে। সে শ্রীহরিবংশের নামের মধ্যে প্রতিদিন নতুন রতি অনুভব করে এবং শ্রীহরিবংশ যা বলেছেন, তা প্রতিনিয়ত মাথায় ধারণ করে, অর্থাৎ প্রতিনিয়ত তার অনুকূল আচরণ করে। সে শ্রীহরিবংশের কৃপার শক্তিতে নিজের মহাগভীর ভাগ্যের বর্ণনা সকলের মাঝে স্বয়ং করে, কারণ শ্রীহরিবংশপদে সম্পূর্ণ বিশ্বাস রাখার কারণে সে নির্ভয় হয়ে গেছে এবং শ্রীহরিবংশের শক্তিতে সদা গর্জন করে।

! জয় জয় শ্রীহিত অক্রিপা কৃপা প্রকরণ কী জয় জয় শ্রীহিত হরিবংশ !

১০. শ্রীহিত ভক্ত - ভজন

শ্রীহরিবংশ সুধর্ম দৃঢ়, অরু সমুঝত নিজু রীতি ।
তিনকৌ হউঁ সেবক সদা, সু মন ক্রম বচন প্রতীতি ॥
মন-ক্রম-বচন প্রতীতি, প্রীতি দিন চরণ পখারঁ ।
নিত প্রতি জূঠন খাঁও, বরণ ভেদহি ন বিচারো ॥
তিনকী সংগতি রহে, জাতি-কুল-মদ সব নংশহি ।
সন্তত সেবক সদা ভজত, জে শ্রীহরিবংশহি ॥১॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - যেই উপাসকগণ শ্রীহরিবংশের ধর্মে দৃঢ় এবং ভজনের সহজ রীতিকে হৃদয়ে ধারণ করেন, আমি মন, কর্ম ও বচন দ্বারা তাঁদের চরণে অটল প্রতীতি (বিশ্বাস) স্থাপন করে সর্বদা তাঁদের দাস। এইরূপ উপাসকদের প্রতি মন–কর্ম–বচনে প্রতীতি রেখে, প্রীতিপূর্ণচিত্তে আমি নিত্য তাঁদের চরণ ধুই ধুই পান করি। তাঁহারা উচ্চবর্ণের হোক বা নীচবর্ণের, এই ভেদবুদ্ধি না করিয়া আমি তাঁদের নিত্য জূঠন গ্রহণ করি। (সেবকজি বলেন:) যেসব সেবক সদা শ্রীহরিবংশের ভজন করেন, তাঁদের সঙ্গ দ্বারা জাতি ও কুলের গর্ব সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়।

সব অনন্য সাঁচে সুবিধি, সবকৌ হউঁ নিজু দাস ।
সুমিরন নাম পবিত্র অতি, দরস পরস অঘ নাস ॥
দরস–পরস অঘ নাস, বাস নিজ সংগ করউঁ দিন ।
তিন মুখ হরি–জস শুনত শ্রবন মানউঁ ন তৃপিত ছিন ॥
কলি অভদ্র বরনত সহস, কলি কামাদিক দ্বন্দ তব ।
সেবক শরণ সদা রহৈ, সুবিধি সাঁচে অনন্য সব ॥২॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - (শ্রীহরিবংশ ধর্মকে দৃঢ়ভাবে গ্রহণ করিয়াছেন যাঁহাদের, সেই রসিক অনন্যগণের পরিচয় পূর্ব ছন্দে দেওয়া হইয়াছে) — সেই সকল অনন্য উপাসকই সত্যরূপ, পরম সত্যপ্রাণ। আমি তাহাদের সকলেরই সহজ দাস। তাঁদের নামের স্মরণে জীব পরম পবিত্র হয়, আর তাঁদের দর্শন ও চরণস্পর্শে সমস্ত পাপ বিনষ্ট হয়। যাঁহারা কেবল দর্শন ও স্পর্শমাত্রেই পাপ-নাশ করেন, সেই রসিক অনন্যগণের সঙ্গেই আমি দিনরাত বাস করিতে চাই। তাঁদের মুখ হইতে শ্রীহরির যশ শ্রবণ করিলে আমার কর্ণ এক ক্ষণমাত্রও তৃপ্ত হয় না। এই অনন্যজনেরা (হরিযশের সহিত) কলিযুগের সহস্র অনিষ্টের ও কামাদি দ্বন্দ্বের বর্ণনা করেন, যাহা শ্রবণে মন পরিশুদ্ধ হয়। সেবকজি বলেন— আমি এই সকল অনন্য উপাসকদের শরণে সদা থাকি, কারণ তাঁহারা সকলেই সত্যে পরিপূর্ণ, প্রকৃত অনন্য।

রাধাবল্লভ ভজত ভজि, ভলি ভলি সব হোই ।
রসিক অনন্য সাজাতি ভজि, ভলি–ভলি সব হোই ॥
ভলি–ভলি তব হোই যখনি হরিবংশ–চরণ–রতি ।
ভলি–ভলি তব হোই রচিত রস–রীতি সদা মতি ॥
ভলি–ভলি সব হোই ভক্তি গুরু–রীতি আগাধা ।
ভলি–ভলি সব হোই ভজত ভজि শ্রীহরি–রাধা ॥৩॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - শ্রীরাধাভল্লভলালের ভজনকারীদের ভজন করিলে সর্বপ্রকারে মঙ্গল হয়। নিজের সাজাতীয় অর্থাৎ শ্রীহরিবংশ ধর্মের অনুগামী রসিক অনন্যদের ভজন করিলেও সর্বপ্রকারে মঙ্গল হয়। যখন শ্রীহরিবংশচরণে প্রেম উদিত হয়, তখন সর্বপ্রকারে মঙ্গল হয়, আর যখন শ্রীহরিবংশের রসরীতিতে বুদ্ধি সর্বকালের জন্য রঞ্জিত হয়, তখনও সর্বপ্রকারে মঙ্গল হয়। শ্রীগুরুর প্রদর্শিত ভজনপদ্ধতিতে যদি আগাধ ভক্তি থাকে, তাহাতেও সর্বপ্রকারে মঙ্গল হয়, এবং যাঁহারা শ্রীহরিরাধার ভজন করেন, তাঁহাদের ভজন করিলে পরিপূর্ণভাবে সর্বপ্রকারে মঙ্গল লাভ হয়।

রাধাবল্লভ ভজত ভজি, ভলি–ভলি সব হোই।
অশুভ অনর্ভল সংগ জন, বিমুখ তজৌ সব কোই॥
বিমুখ তজৌ সব কোই ঝুঁঠ বলত সচু মানত ।
দোষ করত নিরশঙ্ক রঙ্ক করि সনতন জানত ॥
অভিমানি গর্বিষ্ঠ লোভ মদ–মত্ত মত্ত আগাধা ।
দুষ্ট পরিহরৌ দূর ভজত ভজি শ্রীহরি–রাধা ॥৪॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - শ্রীরাধাভল্লভলালের ভজনকারীদের ভজন করিলে সর্বপ্রকারে মঙ্গল হয়। সকল উপাসককে উচিত—অশুভ ও কুসমাগমকারী বিমুখজনদের সঙ্গ ত্যাগ করা। যে বিমুখেরা মিথ্যা কথা বলে তাহাকে সত্য বলে মানে, যে নির্ভয়ে দোষাচরণ করে চলে এবং সাধুসন্তদের কঙ্গাল বলে অবজ্ঞা করে—তাহাদিগকে ত্যাগ করাই কর্তব্য। যাহারা অহংকারে মত্ত, গর্বিষ্ঠ—অর্থাৎ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কর্মেরও গর্বে পূর্ণ, এবং যাহারা লোভের মদে আকুলভাবে মাতাল, সেই দুষ্টজনদের হইতে দূরত্ব রক্ষা করিয়া শ্রীরাধাহরির ভজনকারীদের ভজন করিতে হইবে।

রাধাবল্লভ ভজত ভজি, ভলি-ভলি সব হোই।
জিতে বিনায়ক শুভ-অশুভ, বিঘ্ন করেণ নহিঁ কোই॥
বিঘ্ন করেণ নহিঁ কোই ডরে কলি-কাল কষ্ট ভয় ।
রহে সকল সন্তাপ হরষি হরি নাম জপত জয় ॥
শ্রী বৃন্দাবন নিত্য কেলি কল করত আগাধা ।
হিত হরিবংশ কিশোর ভজত ভজি শ্রীহরি - রাধা ॥৫॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - শ্রীরাধাভল্লভের ভজনকারীদের ভজন করিলে সর্বপ্রকারে মঙ্গল হয় এবং সকল শুভ বা অশুভ বিঘ্নরাজও বিঘ্ন সৃষ্টি করিতে পারে না। এইরূপ ভজনকারীদের নিকটে দুর্বুদ্ধি পরিপূর্ণ কলিযুগের নানা দুঃখ ও কালের ভয়ও শঙ্কিত হয়, এবং কষ্ট প্রদানের স্থলে কষ্ট বিনষ্ট করিয়া ফেলে। কারণ, আনন্দভরে ও উৎসাহপূর্ণ হৃদয়ে শ্রীহরিনাম জপ করিলে সর্বত্র বিজয় লাভ হয়। অতএব, শ্রীবৃন্দাবনে নিত্য অগাধ রসরসে মগ্ন সুন্দর ক্রীড়া করিতে থাকেন যেই শ্রীহিতহরিবংশযুগলকিশোর শ্রীরাধাহরির, তাহাদের ভজনকারীদের ভজন করিতে হইবে।

রাধাবল্লভ ভজত ভজি, ভলি-ভলি সব হোই।
ত্রিবিধ তাপ নাসহিঁ সকল, সব সুখ সম্পতি হোই॥
সব সুখ-সম্পতি হোই হোই হরিবংশ চরণ রতি ।
হোই বিষয়-বিষ নাস হোই বৃন্দাবন বস গতি ॥
হোই সৃদৃঢ় সৎসঙ্গ হোই রস-রীতি আগাধা।
হোই সুজস জগ প্রগট হোই পদ প্রীতি সু রাধা ॥৬॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - শ্রীরাধাভল্লভের ভজনকারীদের ভজন করিলে সর্বপ্রকারে মঙ্গল হয়, ত্রিতাপ—শারীরিক, মানসিক ও দৈবজনিত—নাশ পাইয়া পূর্ণ সুখসম্পদ লাভ হয়। এইরূপ ভজনের ফলে সমগ্র সুখসম্পদ প্রাপ্ত হয়, শ্রীহরিবংশচরণে রতি জন্মে, বিষয়বিষ নাশ পায় এবং জীবনের সম্পূর্ণ গতি শ্রীবৃন্দাবনের অধীন হইয়া যায়, অর্থাৎ জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হৃদয়ে শ্রীবৃন্দাবনরসের বৃদ্ধি করাই থাকে। এই ভজন দ্বারা দৃঢ় সত্যসঙ্গ প্রাপ্ত হয়, অগাধ রসরীতি অনুভব হয়, জগতে সুশ্রুতি প্রসারিত হয় এবং শ্রীরাধাচরণকমলে প্রীতি জন্মে।

রাধাবল্লভ ভজত ভজি, ভলি ভলি সব হোই।
ভীর মিটৈ ভট-যমন কি, ভয়-ভঞ্জন হরি সোই ॥
ভয় ভঞ্জন হরি সোই ভরম ভুল্যৌ ভটকত কত।
ভগবত-ভক্তি বিচার বেদ ভাগবত প্রীতি রতি ॥
ভক্ত চরণ ধরি ভাব তরত ভব-সিন্ধু আগাধা।
হিত হরিবংশ প্রসংশ ভজত ভজি শ্রীহরি - রাধা ॥৭॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - শ্রীরাধাভল্লভের ভজনকারীদের ভজন করিলে সর্বপ্রকারে মঙ্গল হয় এবং যমদূতের ভয় লোপ পায়, কারণ শ্রীহরি স্বভাবতই ভয়নাশক। যখন নিশ্চিত যে একমাত্র শ্রীহরিই ভয়ভঞ্জন, তখন হে জীব, ভ্রমে মত্ত হইয়া ইহুদিক-ওহুদিক কেন ঘুরিতেছ? ক্ষুদ্র দেবদেবীর আশ্রয় কেন গ্রহণ করিতেছ? অতএব ভগবৎভক্তির চিন্তন কর, কারণ বেদ ও ভাগবত তথা ভক্তগণ ভগবৎপ্রীতিতেই আসক্ত, অন্য কোন সাধনকে তত গুরুত্ব দেয় না। ভক্তচরণে প্রেম রাখিলে জীব অগাধ সংসারসাগর পার হইয়া যায়। সুতরাং শ্রীহিতহরিবংশ দ্বারা প্রশংসিত শ্রীহরিরাধার ভজনকারীদের ভজন কর।

রাধাবল্লভ ভজত ভজি, ভলি-ভলি সব হোই।
অন্য দেব সেৱী সকল, চলত পুঞ্জি সী খই ॥
চলত পুঞ্জি সী খই রই–ঝখী দ্যৌস গঁৱাৱত।
সোই ছপাত সব রেইন জই কাপি-সম জু নচাৱত ॥
ভই বিষম বিষ-বিষয় কোই সৎগুরু নহিঁ লাধা।
ধই সকল কলি-কলুষ ধই ভজি শ্রীহরি-রাধা ॥৮॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - শ্রীরাধাভল্লভের ভজনকারীদের ভজন করিলে সর্বপ্রকারে মঙ্গল হয়। অন্য দেবতার উপাসকরা জীবনের অমূল্য পুঁজি—শ্বাস ও মানবজন্ম—নষ্ট করিয়া শূন্যহস্তে সংসার হইতে চলে যায়। এরা দিন কাটায় ক্রন্দনে, রাত্রি কাটায় নিদ্রায়, স্ত্রীর আজ্ঞায় বাঁদরের ন্যায় নৃত্য করিয়া। তাহাদের রোমে রোমে বিষয়-বিষ ভরিয়া থাকে, কারণ তাহারা সদ্‌গুরুপ্রাপ্ত নহে। অতএব ভক্তিভজনে দ্বারা কলিযুগের সমুদয় কালিমা ধুইয়া একমাত্র শ্রীহরি-রাধারই ভজন করিতে হইবে।

রাধাবল্লভলাল বিনু, জীবন-জন্ম অকথ।
বাধা সব কুল কর্ম-কৃত, তুচ্ছ ন লাগৈ হৎথ ॥
তুচ্ছ ন লাগৈ হৎথ, সন্ত সমর্থ ন বিয়ৌ তব ।
মাথ ধুনৎ হরি–বিমুখ সঙ যম-পন্থ চলত যব ॥
গাথ–বিমল গুণ গান কত্থ জস শ্রবণ আগাধা ।
নাথ অনাথন হিত সমর্থ মোহন শ্রীরাধা ॥৯॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - শ্রীরাধাভল্লভলালের বিনা মানবজীবন ও জন্ম নিঃসার। কুলকর্মাদি সমস্তই জীবনের সাফল্যের প্রতিবন্ধক এবং তাহাদের দ্বারা কিছুই লাভ হয় না। যখন এইরূপ হরিবিমুখ ব্যক্তি মস্তক পিটিয়া যমদূতদের সংগে যমপন্থে (নরকের পথে) গমন করে, তখন তাহার সহায় হইবার মত কোন হরিভক্তও থাকে না, যে তাহার রক্ষা করিতে পারে। অতএব জীবনের সার্থকতার জন্য অনাথনাথ, সর্বসমর্থ হিতকারী শ্রীরাধামোহনের নির্মল লীলা-চরিত্রের গুণগান করিতে হইবে এবং তাহার যশ নিরন্তর শ্রবণ ও কীর্তন করিতে হইবে।

কর্মঠ কঠিন সস্ল্য নিত, সোঁচত শীর্ষ ধুনন্ত।
শ্রীহরিবংশ জু উদ্ধরী, সোই রস-রীতি শুনন্ত ॥
সোই রস-রীতি শুনন্ত, অন্ত অসহন করত সব।
যব-যব জিয়ন বিবেচার সার মানত মন-মন তব ॥
ছিন-ছিন ললুপ চিত্ত সমুঝি ছাঁড়ত তাতেঁ শঠ।
করত ন সনৎ সমাজ জিতে অভিমানি কর্মঠ ॥১০॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - দুঃখিত ও কঠোরহৃদয় কর্মনিষ্ঠ লোকেরা (যারা বৈদিক ও তান্ত্রিক কর্মানুষ্ঠান করে) সর্বদা চিন্তাগ্রস্ত থাকে ও মস্তক পিটিতে থাকে। যখন তারা নিজের অবস্থার জন্য অনুতপ্ত হয়, তখন শ্রীহরিবংশচন্দ্র প্রতিষ্ঠিত রসরীতি শ্রবণ করে। শ্রীবৃন্দাবনের এই রসরীতি শুনিয়া ও বুঝিয়া, শেষপর্যন্ত সেই কর্মনিষ্ঠ লোকেরা তাহার প্রতি ঈর্ষা করিতে থাকে। পুনরায় মননে ভাবিলে তাহারা একে সারবান বলিয়া মানে। এই দুঃখিতহৃদয় কর্মনিষ্ঠদের দ্বারা শ্রীবৃন্দাবনের রসরীতির গ্রহণ ও ত্যাগের এই দোলাচল এই কারণে যে, এই শঠদের চিত্ত সর্বদা লোলুপ থাকে, অর্থাৎ নিজেদের দ্বারা সম্পন্ন কর্মের ফলপ্রাপ্তির লোভ তাহারা ত্যাগ করিতে পারে না। এইজন্যই এই অহঙ্কারী কর্মনিষ্ঠরা শুদ্ধ নিষ্কাম ভক্তির আচরণকারী রসিক সাধুদের সঙ্গ করে না।

হিত হরিবংশ প্রসংশ মন, নিত সেবন বিশ্রাম।
চিত নিষেধ-বিধি সুধি নহিঁ, বিতু সঞ্চিত নিধি নাম ॥
বিতু সঞ্চিত নিধি নাম, কাম সুমিরন দাসন্তন।
জাম-ঘটি ন বিলম্ব, বাম-কৃত করত নিকট জন ॥
গ্রাম-পন্থ-আরণ্য দাম দৃঢ় প্রেম গ্রন্থিত নিত।
তা মন রত সুখরাশি, বাম-দৃশ নবকিশোর হিত ॥১১॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - রসভজননিষ্ঠ এই রসিকগণ মনেমনে শ্রীহিতহরিবংশের কৃপাস্মরণসহ প্রশংসা করিয়া শ্রীশ্যামশ্যামের নিত্যসেবাতেই পরমশান্তি অনুভব করেন। বিধি-নিষেধের চিন্তা তো দূরের কথা, তাহাদের চিত্তে তাহার স্মৃতিও উদয় হয় না, কারণ তাহারা শ্রীহরিবংশনামরূপ অমূল্য নিধি সঞ্চিত করিয়া রাখিয়াছে। নামরূপ এই ধন সঞ্চয় করিয়া তাহাদের জীবনের একমাত্র কর্ম হইয়াছে নামস্মরণ ও দাস্যভাবসহ ইষ্টসেবা। ইষ্টের সদানিকটে অবস্থানকারী এই ভক্তরা সখীভাবসহ সেবা করিতে থাকে এবং প্রহরমাত্র বিলম্বও করে না। গার্হস্থ্য, বনপ্রস্থ ও সন্ন্যাস – এই তিন আশ্রমই প্রেমের দৃঢ়সূত্রে নিত্যভাবে আবদ্ধ, অর্থাৎ প্রেমের উৎপত্তি ও বিকাশ এই তিন আশ্রমেই সমভাবে সম্ভব। এই প্রেমতত্ত্বেই সুখরাশিশ্রুতি বামদৃষ্টি শ্রীপ্রিয়াজূ ও প্রেমমূর্তি নবলকিশোর অনুরক্ত।

শ্রীরাধা আন্নন কমল, হরি-অলি নিত সেবন্ত।
নব-নব রতি হরিবংশ হিত, বৃন্দাবিপিন বসন্ত ॥
বৃন্দাবিপিন বসন্ত পরস্পর বাহুদণ্ড ধরি।
চলত চরণ গতি মত্ত করিনি গজরাজ গর্ব ভরি ॥
কুঞ্জ-ভবন নিত কেলি করত নব নবল আগাধা।
নানা কাম প্রসঙ্গ করত মিলি হরি-শ্রীরাধা ॥১২॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - শ্রীরাধার মুখকমলরূপ মধুর সুধাসাগরে শ্রীহরি ভ্রমররূপে নিত্যসেবন করিতে থাকেন। শ্রীরাধা ও শ্রীহরির পারস্পরিক নিত্যনবীন রতি শ্রীহরিবংশহিত, অর্থাৎ এই রতিই ‘হিত’ শব্দে বাচ্য — ‘হিত’ বলিয়া পরিচিত। এই উভয়ে প্রেমধাম, শ্রীবৃন্দাবিপিনে নিত্যবাস করেন। শ্রীরাধা ও শ্রীহরি পরস্পরের অঙ্গে ভুজা রাখিয়া শ্রীবৃন্দাবিপিনে অবস্থান করেন এবং সেখানকার প্রেমবীথিতে গর্বিত করিণী ও গজরাজের ন্যায় মত্তগতি ভরে বিচরণ করেন। শ্রীরাধা ও শ্রীহরি শ্রীবৃন্দাবনের কুঞ্জভবনে নিত্যনবীন ও আগাধরসপূর্ণ কেলি করিতে থাকেন এবং উভয়ে মিলিয়া নানা প্রকার প্রেমপ্রসঙ্গরস সঞ্চার করিয়া আনন্দলীলায় মগ্ন থাকেন।

মুখ বিহংসত হরিবংশ হিত, রুখ রস রাশি প্রবীন।
সুখ সাগর নগর-গুরু, পুহুপ-সৈন আসীন ॥
পুহুপ-সৈন আসীন কীন নিজু প্রেম কেলি-বস।
পিন উরজ বর পরসি ভীন নব-সুরতারঙ্গ-রস ॥
খীন নিরখি মদ-মদন দীন পাবাত জু বিলখি দুখ।
মীণকেতু নির্জিত সু লীন প্রিয় নিরখি বিহংসি মুখ ॥১৩॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - শ্রীহরিবংশের ‘হিত’ স্বরূপ শ্রীশ্যামাশ্যামের মনে যখন প্রভীণরূপে রসমণ্ডলের আস্বাদের অনুরাগ জাগিল, তখন তাহাদের মুখারবিন্দ প্রসন্নতার হাস্যে বিকশিত হইল। এই সময় সুখসাগর শ্রীপ্রিয়াজূ ও নাগরগুরু, অর্থাৎ চতুরশিরোমণি শ্রীলালজূ, পুষ্পশয্যায় আসীন। এই দুই (শ্রীপ্রিয়া-লাল) পুষ্পশয্যায় বিরাজমান, এবং তাহাদের সহজ পারস্পরিক প্রেম এই সময় কেলির বশীভূত হইয়াছে—অর্থাৎ তাহাদের সহজ প্রেমের উপর শৃঙ্গার-কেলি নৃত্য করিতেছে। শ্রীশ্যামঘন শ্রীপ্রিয়ার পূষ্ট উরোজস্পর্শ করিতেছেন, যাহার ফলে উভয় (শ্রীশ্যামা-শ্যাম) নূতন শৃঙ্গারকেলির রঙরসে স্নাত হইয়াছেন। এই অতুল রসরঙ্গে কামদেবের গর্ব ক্ষীণ হইয়া যায়, সে দুঃখবিহ্বল ও দীন হইয়া পড়ে। এইরূপে, প্রিয়ালালের শ্রমিত মুখদর্শনে কামদেব পরাজিত হইয়া তাহাদের দর্শনসুখে লীন ও মোহিত হইয়া যায়।

রস-সাগর হরিবংশ হিত, লসত সরিত-বর তীর।
জগ জস বিশদ সুবিস্তরৎ, বসত জু কুঞ্জ-কুটীর ॥
বসত জু কুঞ্জ-কুটীর ভীর নব রং ভামিনী ভর।
চীর নীল গৌরাং সরস ঘন তন পীতাম্বর ॥
ধীর বহত দক্ষিণ সমীর কল-কেলি করত অস।
নীরজ-শয়ন সু রচিত বীর বর সুরতারঙ্গ রস ॥১৪॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - রসসাগর শ্রীহরিবংশ ‘হিত’ শ্রেষ্ঠ সরিতা শ্রীযমুনাজীর তীরে সুশোভিত। যমুনাতটস্থিত কুঞ্জকুটীরে স্থায়ী নিবাস করিয়া তিনি সমগ্র জগতে স্বীয় বিশদ যশের বিস্তার করিতেছেন। মহানের এই অল্পে (এক কুটীরেই) অবস্থান সমগ্র জগতে তাহার যশবিস্তাররূপে প্রকাশ পাইয়াছে—অর্থাৎ তাহার এই কেলিই সমগ্র বিশ্বে যশের প্রসার ঘটাইয়াছে। সে নিজে যদিও কুঞ্জকুটীরেই নিবাস করে, তথাপি সেই কুটীরেই কেলি চলিতেছে, যেখানে নবরঙ শ্রীশ্যামঘন ও ভামিনী শ্রীপ্রিয়াজূর প্রেমাবেশের অতিশয়তা সঞ্চারিত। গৌরাঙ্গী শ্রীপ্রিয়াজূ নীলাম্বর পরিধান করিয়াছেন, আর রসপূর্ণ মেঘসদৃশ শ্রীশ্যামসুন্দরের দেহে পীতাম্বর শোভিত। শৃঙ্গারকেলির রঙরস ভোগে পরমপটু শ্রীশ্যামাশ্যাম কমলপুষ্পদল দ্বারা শয্যা নির্মাণ করিয়াছেন, আর সেই শয্যার উপর তাঁহারা এমন এক অতুলনীয় কেলি করিতেছেন যাহা দর্শনে মলয়পবন পর্যন্ত মোহিত ও বিহ্বল হইয়া পড়িয়াছে; সে মৃদুগতিতে প্রবাহিত হইতেছে—অর্থাৎ বিস্ময়বিহ্বলতায় তাহার গতি শিথিল হইয়াছে।

পিয় বিচিত্র বন হরষি মন, জিয় জস বাইনু কুনন্ত।
তিয় তরুনি শুনি তুষ্ট ধুনি, কিয়ৌ তহাঁ গমন তুরন্ত ॥
কিয়ৌ তহাঁ গমন তুরন্ত কন্ত মিলি বিলসত সর্বস।
তন্ত রাসমণ্ডল জুরন্ত রস নৃত্য রং রস ॥
সন্তত সুর দুন্দুভি বাজন্ত বরসন্ত সুমন লিয়।
অন্ত কেলি জল জনুকি মত্ত ইভ রাত করিনি প্রিয় ॥১৫॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - শ্রীবৃন্দাবনের আশ্চর্য শোভা দর্শনে প্রিয়তম শ্রীশ্যামসুন্দরের মন আনন্দে উল্লসিত হইল, আর প্রেমপূর্ণ হৃদয়ের ঐশ্বর্যগাথা গাওয়া বেণুবাদ্য তিনি বাজাইলেন। বেণুর সেই প্রফুল্ল ধ্বনি শ্রবণ করিয়া তরুণী গোপিকাগণ তৎক্ষণাৎ শ্রীশ্যামসুন্দরের সান্নিধ্যে উপস্থিত হইলেন। গোপীগণ প্রিয়তমের সন্নিকটে গিয়া তাঁহার সহিত মিলনে প্রেমসম্ভার উপভোগে নিমগ্ন হইলেন। তখনই রসমণ্ডল গঠিত হইয়া রসপূর্ণ নৃত্যে রঙরসের নবসৃষ্টি হইল। রাসকালের সে মুহূর্তে দেবগণ দুনদুভি নাদ করিয়া আকাশ হইতে পুষ্পবৃষ্টি করিলেন। রাসের পরিশেষে সকলে শ্রীযমুনাজীতে প্রবেশ করিয়া এমন জলকেলি করিতে লাগিলেন যেরূপ মত্ত গজরাজ তাহার প্রিয় করিণীদের সহ ক্রীড়া করে।

হরি বিহরত বন যুগল জনু, তড়িত সুপুপ ঘন সঙ।
করি কিসলয় দল সৈন ভল, ভরি অনুরাগ অভঙ্গ ॥
ভরি অনুরাগ অভঙ্গ রং নিজের সচু পাবাত।
অঙ্গ-অঙ্গ সাজি সুভট জঙ্গ মনসিজহিঁ লজाবাত ॥
পংগু দৃশতি ললিতাদি তঙ্ক নিরখত রন্ধ্রন করি।
মঙ্গাদি রচি শিথিল সাজত উচ্ছং ধরত হরি ॥১৬॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - শ্রীহরি স্বীয় স্বাভাবিক যুগলরূপে শ্রীবৃন্দাবনে বিহার করিতেছেন। তাঁহাদের দর্শনে মনে হয় যেন মনোরম মেঘের সহিত রূপসী বিদ্যুৎ দোল খাইতেছে। বনরমণীয় নিভৃত নিকুঞ্জে যুগল শ্রীশ্যামাশ্যাম অবিচ্ছেদ্য অনুরাগে পূর্ণ হইয়া কিসলয়পত্রে এক মনোহর শয্যা নির্মাণ করিয়াছেন। শ্রীশ্যামাশ্যাম অবিচ্ছিন্ন প্রেমরঙ্গে নিমগ্ন হইয়া সেই রসেই পরমসুখ আস্বাদন করিতেছেন। উভয়ের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ উৎসাহে দীপ্ত, যেন পরাক্রমশালী বীরের সাজসজ্জায় সুশোভিত, এবং তাহাদের পারস্পরিক প্রণয়যুদ্ধ কামদেবের যুদ্ধকেও লজ্জিত করে। ললিতাাদি সখীগণ যাহাদের দৃষ্টি যেন স্তব্ধ হইয়া গিয়াছে, কুঞ্জকুটীরের সূক্ষ্ম ছিদ্র হইতে একদৃষ্টে সেই অপূর্ব প্রেমবিহার দর্শন করিতেছেন—যেখানে শ্রীপ্রিয়াজুর মাঙ্গল্যচিহ্ন ও বেণী শিথিল হইয়া পড়িলে শ্রীহরি তাঁহাকে কোলে বসাইয়া পুনরায় বেণীর রচনা করিতেছেন।

শ্যাম সুভগ তন বিপিন ঘন, ধাম বিচিত্র বানাই।
তা মহিঁ সঙম যুগল জন, কাম-কেলি সচু পাই ॥
কাম-কেলি সচু পাই দাই ছল প্রিয়হি রিঝाবত।
ধাই ধরত উর অঙ্ক ভাই গন কক লজाবত ॥
চায় চবগ্গুন চতুর রাই রস রতি সঙ্রামহিঁ।
ছাই সুজস জগ প্রগট গাই গুণ জীবত শ্যামহিঁ ॥১৭॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - মনোরম শরীরবল্লভ শ্রীশ্যামসুন্দর সঘন বিপিনে এক অপূর্ব কুঞ্জধাম রচনা করিয়াছেন। সেই কুঞ্জে যুগল শ্রীশ্যামাশ্যাম মিলিত হইয়া কামকেলি (প্রেমক্রীড়া) দ্বারা পরমসুখ আস্বাদন করিতেছেন। প্রেমকেলির সেই রসরঙ্গে শ্রীশ্যামঘন প্রেমের চতুর ছলভরে শ্রীপ্রিয়াজুকে মহিত করছেন​। কখনো তিনি উচ্ছ্বাসভরে তাঁহাকে হৃদয়ে আঁকড়িয়া ধরিতেছেন, আবার কখনো স্নেহভরে কোলে তুলিয়া লইতেছেন—যাহা দর্শন করিয়া স্বয়ং শ্রৃঙ্গারকেলির সমষ্টিও লজ্জিত হইতেছে। চতুরশিরোমণি শ্রীশ্যামঘনের প্রণয়চাপল্য ও চাওয়া-রস-রতি-সংগ্রাম সেই কেলিকে চতুর্গুণ রসময় ও সুখময় করিয়া তোলে। এই দিৱ্য প্রেমকেলির মনোহর যশ রসিকাচার্যগণের দ্বারা প্রকাশিত হইয়া জগতে ছায়িত হইয়াছে এবং তাহার গুণগান করিয়া রসিকজনগণ জগতে দিৱ্য শ্রৃঙ্গারকে চিরজীবিত রাখিতেছেন—অর্থাৎ তাহাকে সদা ভোগ্য ও অনুভবযোগ্য করিয়া তুলিতেছেন।

সরিতা-তট সুরদ্রুম নিকট, অলি তা সুমন সুবাস।
ললিতাদিক রসননি বিবস, চলি তা কুঞ্জ নিবাস ॥
চলি তা কুঞ্জ নিবাস আস তব হিত মগ পরখত।
রাসস্থল উত্তম বিলাস সচি মিলি মন হরষত ॥
তাসু বচন শুনি চিত হুলাস বিরহজ দুখ গলিতা।
দাসন্তন কুল জুবতি মাস মাধব সুখ-সরিতা ॥১৮॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - শ্রীযমুনাতটস্থিত কল্পবৃক্ষের নিকটে, যেখানে ভ্রমরমালা পুষ্পসুগন্ধে মত্ত এবং ললিতাদি সখীগণ রসরসে অভিভূত, হে প্রিয়াজু! তুমি সেই কুঞ্জনিবাসে চল। সেই কুঞ্জে চল, যেখানে ললিতাদি তোমার দাসীগণ হিতপথ অবলম্বন করিয়া তোমার কল্যাণচিন্তায় নিমগ্ন, তোমার আগমনের প্রতীক্ষায় চিত্ত স্থির করিয়া রহিয়াছে। কারণ রাসস্থলে তুমি প্রিয়তমের সহিত মিলন করিয়া হর্ষে উচ্ছ্বসিত হও এবং অনুপম বিলাসরচনার সৃজন কর। সখীবচন শ্রবণে শ্রীপ্রিয়াজুর অন্তরে উল্লাস উদিত হইল ও বিরহজনিত দুঃখ গলিয়া গেল। শ্রীপ্রিয়াজু রাসমণ্ডলে উপনীত হইতেই যুবতীকুল—ললিতাদি সখীগণ—তাঁহার দাস্যসেবায় প্রবৃত্ত হইল, আর এই মাধব মাসের রাসে পরিপূর্ণ সুখস্রোত প্রবাহিত হইতে লাগিল।

পরখত পুলিন সুলিন গিরা, করষত চিত সুর-ঘোর।
হরষত হিত নিত নবল রস, বরষত যুগল কিশোর ॥
বরষত যুগল কিশোর জোর নবকুঞ্জ সুরত-রণ।
মোর চন্দ্র চয় চলত ডোর কচ শিথিল সুভগ তন ॥
চোর চিত্ত ললিতাদি কোর রন্ধ্রন নিজু নিরখত।
থোর প্রীতি অন্তর ন ভোর দম্পতি ছবি পরখত ॥১৯॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - করুণাপাত্র রসিক উপাসক যখন শ্রীযমুনাপুলিনের অপূর্ব মাহাত্ম্য অনুভব করিতে আরম্ভ করেন, তখন তাহার বাক্য লীন হইয়া যায়—সে রসমহিমায় নিমগ্ন হইয়া মূক হইয়া পড়ে। যমুনাতীরে নিত্য উচ্চারিত বংশীর অনুনাদ তাহার চিত্তকে আকৃষ্ট করিতে থাকে। এই আকর্ষণে হৃদয়স্থিত ‘হিত’—অর্থাৎ প্রেম—আনন্দোচ্ছ্বাসে উল্লসিত হয়, আর তাহার দৃষ্টি সহজে সেই নিভৃত নিকুঞ্জ পর্যন্ত পৌঁছায়, যেথায় যুগলকিশোর শ্রীশ্যামাশ্যাম নিত্য নূতন রসবর্ষায় নিমগ্ন। নবকুঞ্জে যুগলকিশোর প্রেমোন্মত্ত সমরাভিনয়ে রসবর্ষা করিতে থাকেন। এই রসযুদ্ধে শ্রীশ্যামঘনের মস্তকে শোভিত ময়ূরমুকুট চঞ্চল হইয়া উঠিয়াছে, আর অপরপক্ষে মনোহর দেহবতী শ্রীপ্রিয়ার কেশপাশ শিথিল হইয়া পড়িয়াছে। এই অদ্ভুত প্রেমবিহারে যাঁহার চিত্ত হরণ হইয়াছে, সেই ললিতাদি সহচরীগণ কুঞ্জছিদ্র হইতে একটানা সেই প্রেমবিহার অবলোকন করিতেছেন। তাহাদের অন্তরে অপরিমেয় প্রীতি জাগ্রত, এবং তাঁহারা যুগল শ্রীশ্যামাশ্যামের প্রভাতী রূপচ্ছবি নিরীক্ষণ করিয়া ভাবিতেছেন—এই দুই কিশোর-কিশোরীর মধ্যে কার ছবিই বা অধিক অপূর্ব, কার রূপেই বা অধিক রসের উচ্ছ্বাস।

ঋতু বসন্ত বন ফল সুমন, চিত প্রসন্ন নব কুঞ্জ।
হিত দম্পতি রতি কুশল মতি, বিতু সঞ্চিত সুখ পুঞ্জ ॥
বিতু সঞ্চিত সুখ-পুঞ্জ গুঞ্জ মধুকর সুনাদ ধুনি।
রুঞ্জ-মৃদঙ্গ-উপঙ্গ ধুঞ্জ দফ ঝঞ্ছ তাল শুনি ॥
মঞ্জু জুবতি রস-গান লুঞ্জ ইভ খগ তহাঁ বিত্কিতু।
ভুঞ্জত রাস-বিলাস কুঞ্জ নব সচি বসন্ত ঋতু ॥২০॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - বসন্তঋতুতে শ্রীবৃন্দাবনে নূতন পুষ্প ও ফলের বিকাশে সারা বন পরিপূর্ণ রম্য হইয়াছে, তাহার নবীন কুঞ্জমালা দর্শনে চিত্ত প্রফুল্ল হয়। হিতস্বরূপ দম্পতি শ্রীশ্যামাশ্যাম স্বকুশলমতিপূর্ণ প্রেমবিলাস দ্বারা সুখসমূহরূপ ধনের সঞ্চয় করিয়াছেন—অর্থাৎ তঁহাদের হৃদয় পরম আনন্দে ভরিয়া তুলিয়াছেন। সেই সুখসঞ্চয়ে মধুকরগুঞ্জনের মধুর নাদ মিশ্রিত, রুঞ্জ, মৃদঙ্গ, উপঙ্গ, ঢুঞ্জ, ডফ ও ঝাঁঝের তালধ্বনি প্রতিধ্বনিত। এই রসরূপ সুখমণ্ডলে মঞ্জু যুবতী শ্রীপ্রিয়া জুর গানের রস শুনিয়া বৃন্দাবনের পক্ষীগণ মোহবিষ্ট হইয়া পঙ্গুপ্রায় হইতেছে। এইরূপে রসমূর্তি শ্রীশ্যামাশ্যাম বসন্তঋতুতে নবকুঞ্জসেবন করিয়া রাসবিলাসরূপ পরম আনন্দ ভোগ করিতেছেন।

কহত-কহত ন কহি পরৈ, রহত জু মনহিঁ বিবেচার।
সহত-সহত বাড়়ে ভগতি, গৃহ তন গুরু-হিত গার ॥
গৃহ তন গুরু-হিত গার হার নিজের করি মানত।
চার বেদ সুমৃতি সু চার ক্রম-কর্ম ন জানত ॥
ডারি অবিদ্যা করি বিবেচার চিত হিত হরিবংশহি।
নারি-রসিক হৃদ বন-বিহার মহিমা ন পরৈ কহি ॥২১॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - এই রসভিহারের কীর্তন করিতে গিয়াও আমি তাহা সম্পূর্ণভাবে ব্যক্ত করিতে পারি না, এই ভাব চিরকাল মনে বিরাজ করে। এই মহিমাময় রসরূপ প্রাপ্তির জন্য পরিপুষ্ট ভক্তির প্রয়োজন হয়, আর সেই ভক্তি বৃদ্ধি পায় শ্রীগুরুর নিমিত্তে গৃহ-পরিবার ও শরীর উৎসর্গ করিয়া, সংসারের সকল শুভাশুভ আচরণ সহ্য করিয়া। শ্রীগুরুচরণে গৃহ-পরিবার ও দেহ সমর্পণ করিয়া রসিক উপাসককে সর্ববিষয়ে নিজের পরাজয় মানিতে হয়। তঁহাকে চার বেদ ও স্মৃতিতে বর্ণিত কর্মের ক্রমও জানিবার প্রয়োজন নাই। অতএব অবিদ্যাজাত দুর্বুদ্ধি ত্যাগ করিয়া চিত্তে হিতহরিবংশ, অর্থাৎ পরম তৎ-সুখময় প্রেম ভাবিয়া থাকিতে হইবে। কারণ হিতহরিবংশস্বরূপ শ্রীপ্রিয়া ও পরম গম্ভীর রসিক শ্রীশ্যামঘন যাহা শ্রীবৃন্দাবনে রসভিহার করেন, তাহার মহিমা এতই অসীম যে তাহার বর্ণনা করাও অসম্ভব।

সেবক শ্রীহরিবংশ কে, জগ ভ্রাজত গুণ গাই।
নিশি দিন শ্রীহরিবংশ হিত, হরষি চরণ চিত লাই ॥
হরষি চরণ চিত লাই জপত হরিবংশ গিরা-জস।
মনসি বচসি চিত লাই জপত হরিবংশ নাম-জস ॥
শ্রীহরিবংশ প্রতাপ-নাম নৌকা নিজু খেবক।
ভাব-সাগর সুখ তরত নিকট হরিবংশ জু সেবক ॥২২॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - সেবকজী বলেন, আমি শ্রীহরিবংশের জগতে শোভা দানকারী গুণসমূহের গান করি এবং আনন্দভরে রাত্রিদিন তাঁহার চরণে চিত্ত স্থাপন করি। আমি আনন্দভরে চিত্ত তাঁহার চরণে নিবিষ্ট করিয়া শ্রীহরিবংশবাণীর যশ জপ করি এবং মন-বাক্য দ্বারা চিত্ত নিবদ্ধ করিয়া শ্রীহরিবংশনামের যশের জপ করি। জীবনের নৌকাটিকে শ্রীহরিবংশনামের প্রভাবে চালনা করিয়া, আমি সেবক শ্রীহরিবংশের নিকটে থাকিয়া ভবরসাগর শান্তিতে অতিক্রম করি।

জয় জয় শ্রীহিত ভক্‌ত ভজন প্রকরণ কি জয় জয় শ্রীহিত হরিবংশ!
১১. শ্রীহিত-ধ্যান

সজযতি হরিবংশচন্দ্র নামোচ্চার, বৃদ্ধিত সদা সুবুদ্ধি ।
রসিক-অনন্য-প্রধান সতু, সাধু-মণ্ডলী মণ্ডনো জযতি ॥
জয় জয় শ্রীহরিবংশ হিত, প্রথম প্রণউঁ সির নাই ।
পরম রসদ, নিবিঘ্ন হ্য়, জৈসে কবিত সিরাই ॥
সুকবিত্ত সুছন্দ গনিজৈ সময় প্রবন্ধ-বন ।
সুকবি বিচিত্র ভণিজ্জৈ হরিজস লীন মন ॥
শ্রোতা সোই পরম সুজান সুনত চিত রতি করৈ ।
সোই সেবক রসিক অনন্য বিমল জস বিস্তরৈ ॥
সুজস সুনত, বরনত সুখ পায়ৌ,
কীর-ভৃঙ্গ নারদ-শুক গায়ৌ ।
শ্রীবৃন্দাবন সব সুখদানী,
রতন-জটিত বর ভূমি রমানী ॥
বর ভূমি রমানি সুখদ দ্ৰুম-বল্লী,
প্রফুলিত ফলিত বিভিধ বরনং ।
নিত শরদ- বসন্ত মত্ত মধুকর কুল,
বহু পতত্রি নাদহি করনং ॥
নানা দ্ৰুম-কুঞ্জ মঞ্ঝু বর- বীথী,
বন বিহার রাধারমণং ।
তহাঁ সনতত রহত শ্যাম শ্যামা সংগ,
শ্রীহরিবংশ চরণ শরণং ॥১॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা: রসিক শিরোমণি ও সাধু সমাজের অলঙ্কার শ্রী হরিবংশচন্দ্র জু-র জয় হোক, যাঁর নাম স্মরণে সুবুদ্ধি জাগে। আমি তাঁকে প্রণাম জানিয়ে এই কাব্য আরম্ভ করছি, যেন তা নির্বিঘ্নে অলৌকিক রসে পূর্ণ হয়। সেই কাব্যই শ্রেষ্ঠ যাতে শ্রী বৃন্দাবনে শ্যামা-শ্যামের নিত্য অষ্টযাম লীলা বর্ণিত হয় এবং তিনিই প্রকৃত কবি যাঁর মন হরিনামে মগ্ন। যে পাঠক এই কথা শুনে প্রেমে আপ্লুত হন তিনিই প্রকৃত শ্রোতা, আর যিনি এই যশ বিস্তার করেন তিনিই অনন্য সেবক। শ্রী হরির গুণগানেই পরম সুখ, তাই নারদ ও শুকদেব তাঁরই মহিমা গেয়েছেন। রসিক ভক্তদের বর্ণিত শ্রী বৃন্দাবনভূমি রত্নখচিত ও পরম রমণীয়। সেখানে লতা-গুল্ম ফলে-ফুলে সুশোভিত এবং নিত্যকাল শরৎ ও বসন্ত বিরাজমান। ভ্রমরের গুঞ্জন, পাখির কলরব আর কুঞ্জ-বীথিকায় শ্রী রাধারমণ নিত্য বিহার করেন। শ্রী শ্যামা-শ্যামের নিত্য সঙ্গী সেই শ্রী হরিবংশচন্দ্রের চরণে আমি চিরকাল শরণাগত।

রহত সদা সখি সংগম, রাস-রং রস-রসাল উল্লাস।
লীলা ললিত রসাল, সম সুর তাল, বর্ষত সুখ-পুঞ্জ।
অতুলিত রস বর্ষত সদা সুখনিধান বনবাসী।
অদ্ভুত মহিমা মহি প্রগট সুন্দরতা কি রাশি।
সুন্দরতা কি রাশি কনকদুতি দেহ রুচি।
বারিজ-বাদন প্রসন্ন হাসি মৃদু রং শুচি।
সুভ্রু সুষ্ঠু ললাট-পট সুন্দর করণ।
নৈন কৃপা অবলোকি প্রণত আরতি হরণ।

সুন্দর গ্রীব উরসি বনমাল,
চারু অংস বর বাহু বিশাল।
উদর সুনাভি, চারু কটি দেশ,
চারু জানু, শুভ চরণ সুবেশ।
শুভ চরণ সুবেশ মত্ত গজবর গতি,
পর উপকার দেহ ধরণ।
নিজ গুণ বিস্তার অধার অবনি পর,
বানি বিশদ সুবিস্তরণ।
করুণাময় পরম পুণীত কৃপানিধি,
রসিক অনন্য সভাভরণ।
জয় জগ-উদ্যোত ব্যাসকুল দীপক,
শ্রীহরিবংশ চরণ-শরণ। ॥২॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা: শ্রী হরিবংশচন্দ্র জু সর্বদা শ্রী শ্যামা-শ্যামের সখীদের সঙ্গে সেই শ্রী বৃন্দাবনে বাস করেন, যেখানে সর্বদা রাসের আনন্দ ও দিব্য লীলা বিচ্ছুরিত হয়। সেখানে সুর ও তালের লহরীতে সুখের বৃষ্টি হতে থাকে। বৃন্দাবনের নিত্য নিবাসী শ্রী হরিবংশচন্দ্র সৌন্দর্যের আধার এবং স্বর্ণের ন্যায় তাঁর দেহের কান্তি। তাঁর প্রফুল্ল পদ্মমুখের মৃদু হাসিতে উজ্জ্বল প্রকাশ ছড়িয়ে পড়ে। কৃপাভরা দৃষ্টির মাধ্যমে তিনি আশ্রিতদের সকল কষ্ট হরণ করেন। তাঁর অঙ্গসৌষ্ঠব অতি মনোরম—বক্ষস্থলে বনমালা, বিশাল ভুজযুগল এবং মদমত্ত গজরাজের ন্যায় তাঁর গাম্ভীর্যপূর্ণ গতি। সখী স্বরূপ শ্রী হরিবংশচন্দ্র পরোপকারের জন্যই এই দেহ ধারণ করেছেন এবং ধরাধামে তাঁর অমৃতবাণীর বিস্তার ঘটিয়েছেন। করুণাময়, পরম পবিত্র, রসিককুল শিরোমণি এবং ব্যাস কুলের প্রদীপ শ্রী হরিবংশের শ্রীচরণই আমার একমাত্র আশ্রয়স্থল।
সারাসার বিবেকী, প্রেম-পুঞ্জ অদ্ভুত অনুরাগ ।
হরি যস রস মধু মত্ত, সর্ব ত্যক্ত্বা দুঃস্ত্যজ কুল কর্ম ॥
কর্ম ছাঁড়ি কর্মঠ ভজৈঁ, জ্ঞানী জ্ঞান বিহায় ।
ব্রতধারী ব্রত তজি ভজৈঁ, শ্রবণাদিক চিত লায় ॥
শ্রবণাদিক চিত লাই যোগ, জপ, তপ তজে।
অউরৌ কর্ম সাকাম সকল তজি সব ভজে ॥
সাধন বিবিধ প্রচাস তে সকল বিহাবহি ॥
শ্রবণ কথন সুমিরণ সেবন চিত লাবহি ॥
অর্চন, বন্দন অরু দাসন্তন,
সখ্য অউর আত্মা-সমর্পন ।
এ নব লক্ষণ ভক্তি বাড়াই,
তব তিন প্রেম লক্ষণা পাই ॥
পাই রস-ভক্তি গূঢ় যুগ-যুগ জগ,
দুর্লভ ভব ইন্দ্রাদি বিধিঁ ।
আগম অরু নিগম পুরাণ আগোচর,
সহজ माधুরি রূপ নিধিঁ ॥
অনভয় আনন্দ কন্দ নিজু সম্পতি,
গুপ্ত সুরীতি প্রগট করণং ।
জয় জগ-উদ্যোত ব্যাসকুল-দীপক,
শ্রীহরিবংশ চরণ শরণং ॥৩॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা: শ্রী হরিবংশচন্দ্র জু সার-অসারের বিচারক ও ঘনীভূত প্রেম স্বরূপ। শ্যামা-শ্যামের চরণে তাঁর অনুরাগ অতুলনীয়। তিনি কঠিন কুলধর্ম ত্যাগ করে হরিনাম রসে মত্ত থাকতেন। তাঁর প্রভাবে কর্মীরা কর্ম, জ্ঞানীরা জ্ঞান এবং ব্রতধারীরা নিজেদের কঠোর সাধন ত্যাগ করে শ্রীহরির ভজনে নিমগ্ন হন। তাঁরা কষ্টসাধ্য যোগ-তপস্যা ছেড়ে শ্রবণ, কীর্তন ও স্মরণসহ নবধা ভক্তিতে চিত্ত অর্পণ করেন। এই সাধনার ফলে যখন অর্চন, বন্দন ও আত্মনিবেদন রূপী নবধা ভক্তি বৃদ্ধি পায়, তখন তাঁরা 'প্রেম লক্ষণা' নামক দশমী ভক্তি লাভ করেন। এই পথেই তাঁরা সেই গোপন রস-ভক্তি প্রাপ্ত হন, যা ব্রহ্মা-বিষ্ণু-শিবের নিকটও দুর্লভ এবং বেদ-পুরাণের অগম্য। এই রূপ-মাধুর্যে পূর্ণ গুপ্ত রীতির যিনি প্রবর্তক, সেই জগৎ-জ্যোতি ব্যাসকুলের প্রদীপ শ্রী হরিবংশচন্দ্র জু-র জয় হোক। তাঁর শ্রীচরণই আমার একমাত্র আশ্রয়।

প্রগতিত প্রেম প্রকাশ, সকল জন্তু শিশরি-কৃত চিত্ত ।
গত কলি তিমির সমূহ, নির্মল অকলঙ্ক উদিত জগ চন্দ্রং ॥
বিশদ চন্দ্র তারা-তনয় শীতল কিরণ প্রকাশি ।
অমৃত সীঞ্চত মম হৃদয় সুখময় আনেন্দ - রাসি ॥
সুখময় আনেন্দ রাসি সকল জন শোক হর ।
সমুঝি জে আসে শরণ তে ডরত ন কাল-ডর ॥
দিয়ৌ দান তিন অভয় দ্বন্দ দুখ সব ঘটে ।
নিত-নিত নব নব প্রেম কর্মবন্ধন কাটে ॥

কাটে কর্মবন্ধন সংসারি,
সুখ সাগর পুরিত অতি ভারি।
বিধি নিষেধ শৃঙ্খলা ছুড়াবৈ,
নিজ অলয় বন আনি বসাবৈ ॥
আলয় বন বসত সংগ পারস কে,
আয়স বনক সমান ভয়ং ।
মাঙ্গৌ মন মনসি দাসি আপনি করি,
পূরণ কাম সদা হৃদয়ং ॥
সেবক গুন- নাম আস করি বরণৈ,
অব নিজু দাসি কৃপা করণং ।
জয় জগ উদ্যোত ব্যাসকুল- দীপক,
শ্রীহরিবংশ চরণ শরণং ॥ ৪ ॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা: জগতে কলঙ্কহীন শ্রী হরিবংশ-রূপী চন্দ্রের উদয়ে প্রেমের প্রকাশ ঘটেছে, যার শীতলতায় সর্বজীবের চিত্ত শান্ত হয়েছে এবং কলিযুগের অন্ধকার দূর হয়েছে। তারারাণীর পুত্র শ্রী হরিবংশ জু আনন্দময় অমৃত বর্ষণ করে ভক্তদের শোক হরণ করেন। যাঁরা তাঁর শরণাগত হন, মায়া ও কাল তাঁদের স্পর্শ করতে পারে না। তিনি ভক্তদের অভয় দান করে 'রস-ভক্তি' প্রদান করেন, যা তাঁদের সমস্ত কর্মবন্ধন ছিন্ন করে হৃদয়ে নিত্য নবীন প্রেমের সঞ্চার করে। শ্রী হরিবংশচন্দ্র জু জীবকে বিধি-নিষেধের বন্ধন থেকে মুক্ত করে নিজের সহজ ধাম শ্রী বৃন্দাবনে স্থান দেন। সেখানে এসে লোহা যেমন পরশপাথরের ছোঁয়ায় সোনা হয়ে যায়, অধম জীবও তেমনি দিব্য জ্যোতি লাভ করে। তাই আমি কায়মনোবাক্যে তাঁর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাকে তাঁর নিজ দাসী জ্ঞানে হৃদয়ের সকল বাসনা পূর্ণ করেন। এই অধম সেবক বড় আশা নিয়ে তাঁর গুণগান করছে। জগৎ-জ্যোতি ব্যাসকুলের প্রদীপ শ্রী হরিবংশের শ্রীচরণই আমার একমাত্র আশ্রয়।

পড়ত-গুনত গুন-নাম সদা সত-সঙ্গতি পাবে।
অরু বাড়ে রস-রীতি বিমল বাণী গুন গাৱৈ॥
প্রেম-লক্ষণা ভকতি সদা আনন্দ হিতকারী।
শ্রীরাধা যুগ চরণ প্রীতি উপজৈ অতিভারী॥
নিজ মহল টহল নব কুঞ্জ মে, নিত সেবক সেবা কৰণং।
নিশি-দিন সামীপ সনতত রহৈ, সুশ্রীহরিবংশ চরণ শরণং॥৫॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা: যে ভাগ্যবান উপাসক শ্রী হরিবংশের নাম ও গুণ কীর্তন করেন, তিনি সর্বদা রসিক সন্তদের সঙ্গ লাভ করেন। এর ফলে তাঁর হৃদয়ে 'রস-রীতি' বৃদ্ধি পায় এবং তিনি শ্রী হরিবংশচন্দ্রের বিমল বাণীর মহিমা গানে মগ্ন হন। তাঁর অন্তরে অখণ্ড আনন্দময়ী ও হিতকারী 'প্রেম-লক্ষণা' ভক্তির উদয় হয় এবং শ্রীরাধার যুগল চরণকমলে গভীর প্রীতি জন্মায়। এরপর তিনি নিকুঞ্জ-সেবায় নিত্য নিযুক্ত হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেন এবং শ্রী হরিবংশের চরণে আশ্রিত থেকে শ্রী শ্যামা-শ্যামের চিরন্তন সান্নিধ্য প্রাপ্ত হন।

! জয় জয় শ্রিহিত ধ্যান প্রকরন​ কি জয় জয় শ্রিহিত হরিবংশ !
১২. শ্ৰীহিত মঙ্গল গান

জৈ জৈ শ্রীহরিবংশ ব্যাস-কুল-মণ্ডনা ।
রাসিক অনন্যনি মুখ্য-গুরু জন-ভয় খণ্ডনা ॥
শ্রীবৃন্দাবন বাস রাস-রস ভূমি যেখানে ।
ক্রীড়ত শ্যামা শ্যাম পুলিন মঞ্জুল তহাঁ ॥
পুলিন মঞ্জুল পরম পাবন ত্রিবিধ তহাঁ মারুত বহৈ ।
কুঞ্জ ভবন বিচিত্র শোভা মদন নিত সেবত রহৈ ॥
তহাঁ সন্তত ব্যাস নন্দন রহত কলুষ বিহণ্ডনা ।
জৈ জৈ শ্রীহরিবংশ ব্যাস-কুল-মণ্ডনা ॥১॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা: শ্রী ব্যাস মিশ্রের কুলতিলক শ্রী হরিবংশ জু-র জয় হোক। শ্রী হিত জু মহারাজ অনন্য রসিকাচার্যদের মধ্যে প্রধান গুরু এবং জীবের সংসার-ভয় বিনাশকারী। তাঁর চিরস্থায়ী নিবাস শ্রী বৃন্দাবনে, যা দিব্য রাস-রসের আধার এবং যেখানে যমুনার মনোরম পুলিনে শ্রী শ্যামা-শ্যাম নিত্য প্রেমক্রীড়া করেন। সেই পবিত্র পুলিনে সর্বদা শীতল, মন্দ ও সুগন্ধি বাতাস প্রবাহিত হয়। এখানকার কুঞ্জভবন অত্যন্ত শোভাময়, যা স্বয়ং কামদেব অলঙ্কৃত করেন। সমস্ত দোষ নাশ করতে সমর্থ শ্রী ব্যাসনন্দন সর্বদা এই বৃন্দাবনে বিরাজ করেন। শ্রী ব্যাস কুলের অলঙ্কার সেই শ্রী হরিবংশ জু-র জয় হোক।

জৈ জৈ শ্রীহরিবংশ চন্দ্র উদ্দিত সদা ।
দ্বিজ-কুল-কুমুদ প্রকাশ বিপুল সুখ সম্পদা ॥
পর উপকার বিচার সুমতি জগ বিস্তরী ।
করুণা-সিন্ধু কৃপালু কাল ভয় সব হরী ॥
হরী সব কলি কাল কি ভয় কৃপা রূপ জু বপু ধরযৌ ।
করত যে অনসহন নিন্দক তিনহুঁ পাই অনুগ্রহ করযৌ ॥
নিরভিমান নির্বৈর নিরুপম নিষ্কলঙ্ক জু সর্বদা ।
জৈ জৈ শ্রীহরিবংশ চন্দ্র উদ্দিত সদা ॥২॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা: নিত্য উদিত শ্রী হরিবংশ-রূপী চন্দ্রের জয় হোক। তিনি দ্বিজ-কুল রূপী কমলিনীকে বিকসিত করেন। তাঁর নিত্য উপস্থিতিতে অনুরাগী উপাসকগণ প্রফুল্ল থাকেন এবং অসীম সুখ-সম্পদ লাভ করেন। শ্রী হরিবংশচন্দ্র জু জীবের উপকারের জন্য প্রকট হয়ে সুমতির বিস্তার ঘটিয়েছেন এবং আত্মঘাতী কুুমতি ও কলিযুগের ভয় নাশ করেছেন। এই কঠিনকালেও তিনি প্রেমী ভক্তদের নির্ভয় করেছেন। শ্রী ব্যাসনন্দন মূর্তিমান কৃপা স্বরূপ; যারা ঈর্ষাবশত তাঁর নিন্দা করে, তাদের প্রতিও তিনি অনুগ্রহশীল। তিনি অভিমানহীন, বৈরিতা-শূন্য এবং সর্বথা নিষ্কলঙ্ক। সেই চির-ভাস্বর শ্রী হরিবংশচন্দ্রের জয় হোক।

জৈ জৈ শ্রীহরিবংশ প্রসংশিত সব দুনি।
সারাসার বিবেকিত কোবিদ বহু গুনী ॥
গুপ্ত রীতি আচরণ প্রকাশিত সব জগ দিয়ে।
জ্ঞান-ধর্ম-ব্রত-কর্ম ভক্তি-কিঙ্কর কিয়ে ॥
ভক্তি হিত জে শরন আসে দ্বন্দ-দোষ জু সব ঘতে ।
কমল কর জিন অভয় দীনে কর্ম-বন্ধন সব কাটে ॥
পরম সুখদ সুশীল সুন্দর দেখা স্বামিন মম ধনি ।
জৈ জৈ শ্রীহরিবংশ প্রসংশিত সব দুনি ॥৩॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা: সমগ্র বিশ্ব তাঁর প্রশংসা করে। তিনি মহাজ্ঞানী ও গুণী, তাই ধর্মের ক্ষেত্রে সার-অসারের বিচার করে অনাবশ্যক বিষয় ত্যাগ করেছেন। অন্যদিকে, রসের ক্ষেত্রেও তিনি দুধ ও জলের ন্যায় বিবেকবুদ্ধি প্রয়োগ করে রসের উজ্জ্বলতা ও নিত্যতার বিরোধী তত্ত্বগুলি দূর করেছেন। তিনি শ্রী শ্যামা-শ্যামের কেলির মাধ্যমে শৃঙ্গার রসের গুপ্ত রীতিকে প্রকট করেছেন, যা জগতের কাছে এই রহস্যময় প্রেমলীলাকে সহজবোধ্য করেছে। তিনি জ্ঞান, ধর্ম ও কর্মকে ভক্তির অনুগামী করেছেন। যাঁরা তাঁর প্রেমভক্তির আশায় শরণাগত হন, তাঁদের জাগতিক দ্বন্দ্ব ও দোষ ঘুচে যায়। তিনি যাঁর মস্তকে কৃপাহস্ত রাখেন, সেই ভক্ত অভয় পদ লাভ করে এবং তার সমস্ত কর্মবন্ধন ছিন্ন হয়। 'হে পরম সুখদাতা, সুশীল ও সুন্দর প্রভু! আমার প্রেমভাব রক্ষা করুন।' বিশ্ববন্দিত শ্রী হরিবংশ জু-র জয় হোক।

জৈ জৈ শ্রীহরিবংশ নাম গুণ গাই হ্যায়।
প্রেম-লক্ষণা ভক্তি সুদ্রঢ় করি পাই হ্যায়।
অরু বাড়ে রস-রীতি প্রীতি চিত না টরৈ ।
জীতি বিষম সংসার কীরতি জগ বিস্তরৈ ॥
বিস্তরৈ সব জগ বিমল কীরতি সাধু-সঙ্গতি না টরৈ ।
বাস বৃন্দাবিপিন পাভৈ শ্রীরাধিকা জু কৃপা করুন ॥
চতুর যুগল-কিশোর সেবক দিন প্রসাদহিঁ পাই হ্যায়।
জৈ জৈ শ্রীহরিবংশ নাম-গুণ গাই হ্যায়॥৪॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা: যে উপাসক শ্রী হরিবংশের নাম ও গুণগান করবেন, তিনি পাঁচটি বিশেষ লাভ করবেন। প্রথমত, তাঁর হৃদয়ে সুদৃঢ় 'প্রেম-লক্ষণা' ভক্তির উদয় হবে। দ্বিতীয়ত, শ্যামা-শ্যামের প্রতি অবিচ্ছিন্ন প্রীতি জন্মানোর ফলে মনে প্রতিক্ষণ 'রস-রীতি' বৃদ্ধি পাবে। তৃতীয়ত, এই প্রীতির প্রভাবে তিনি বিষম সংসার জয় করবেন এবং তাঁর কীর্তি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বে। চতুর্থত, তাঁর যশের কারণে প্রেমিক সাধুজন আকৃষ্ট হবেন, ফলে কুসঙ্গ নাশ হয়ে সর্বদা সাধুসঙ্গ লাভ হবে। পঞ্চমত, তিনি শ্রীরাধিকার কৃপা ও অখণ্ড শ্রী বৃন্দাবন বাস লাভ করবেন। এইভাবে যুগল কিশোরের ভজনকারী সেবক সর্বদা তাঁদের কৃপা-প্রসাদ ধন্য হবেন। শ্রী হরিবংশের গুণগানেই এই সকল পরম লাভ সম্ভব।

জয় জয় শ্রীহিত মঙ্গল গান প্রকরণ কী জয় জয় শ্রীহরিবংশ !

১৩. শ্রীহিত পাক‍ে ধর্মী

সাধন বিবিধ সকাম মতি,
সব স্বারথ সেকল সবই জু অনীতি।
গ্যান-ধ্যান- ব্রত- কর্ম জিতে সব,
কাহুঁ মে নহিঁ মোহি প্রতীতি॥
রসিক অনন্য নিশান বাজায়ৌ,
এক শ্যাম-শ্যামা পদ প্রীতি।
শ্রীহরিবংশ চরণ নিজু সেবক,
বিচলাই নহিঁ ছাড়ি রস-রীতি॥১॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা: সকাম বুদ্ধি বা স্বার্থসিদ্ধির জন্য করা নানাবিধ সাধন সম্পূর্ণরূপে স্বার্থপর ও নীতিহীন, যা বিশুদ্ধ প্রেমধর্মের পরিপন্থী। এছাড়া মুক্তিলাভের জন্য জ্ঞানমার্গ, যোগের জন্য ধ্যান এবং বিভিন্ন ব্রত-কর্মের কোনোটিতেই আমার আস্থা নেই; কারণ আমি এগুলোকে ভক্তির প্রসারে উপযোগী মনে করি না। অনন্য রসিগণ ঘোষণা করেছেন যে, তাঁরা একমাত্র শ্রী শ্যামা-শ্যামের চরণকমলের প্রতিই অনুরক্ত। তাই শ্রী হরিবংশ জু-র সহজ সেবকগণ এই দিব্য 'রস-রীতি' পরিত্যাগ করে কদাচ বিচলিত হন না।

শ্রীহরিবংশ ধরম্ম প্রগট্ট, নিপট্ট,
কৈ তাঙ্কি উপমা কৌঁ নাহিঁন।
সাধন তাকৌ সবৈ নব-লক্ষণ,
তচ্ছিন বেগ বিবেচরত জাহিঁ ন।
যো রস-রীতি সদা অবিরুদ্ধ,
প্রসিদ্ধ-বিরুদ্ধ তজত্ত ক্যৌঁ তাহিঁ ন।
যো পাই ধরম্মী কহাবত হৌ,
তৌ ধরম্মী-ধরম্ম সমুজ্ঝত কাহিঁ ন॥২॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা: শ্রী হরিবংশের ধর্ম এক প্রকাশ্য ধর্ম (অত্যন্ত রহস্যময় হলেও এতে বাম-মার্গের মতো কোনো গোপন বা কদাচারী ক্রিয়া নেই); পূর্ণাঙ্গ বিচারে এর তুল্য অন্য কোনো ধর্ম দেখা যায় না। শ্রবণ ও কীর্তনসহ নয় প্রকার ভক্তিই এই ধর্মের প্রধান সাধন। তবে কেন তুমি অবিলম্বে তা বিচার করছ না? অর্থাৎ, কেন নিজের উপাসনায় এই ভক্তিকে দ্রুত কাজে লাগাচ্ছ না? শ্রী হরিবংশচন্দ্র প্রবর্তিত এই 'রস-রীতি' সদা বিরোধমুক্ত। যদি এর সাথে অন্য কোনো রীতির বিরোধ নেই, তবে শ্রীমদ্ভাগবতে বর্ণিত প্রসিদ্ধ ভক্তি-পদ্ধতির বিরোধিতা করছ কেন? তুমি যদি নিজেকে শ্রী হরিবংশ ধর্মের অনুসারী বলে দাবি করো, তবে তাঁর প্রতিষ্ঠিত এই ধর্মের মূল আদর্শ ও রীতি-নীতি কেন হৃদয়ঙ্গম করছ না?

জৌ পৈ ধরম্মিন সোঁ নহিঁ প্রীতি,
প্রতীতি প্রমাণত আন ন আনিবৌ।
একহি রীতি সবন্ন সোঁ হেত,
সমিতি সমেত সমান ন মানিবৌ॥
বাত সোঁ বাত মিলৈ ন প্রমাণ,
প্রকৃতি বিরুদ্ধ জুগত্তি কাউ ঠানিবৌ।
শ্রীহরিবংশ কে নাম ন প্রেম,
ধরম্মী ধরম্ম সমুজ্ঝৌ ক্যৌঁ জানিবৌ॥৩॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা: যদি শ্রী হিত ধর্মের অনুসারীদের প্রতি তোমার অকৃত্রিম প্রেম না থাকে, তবে নিজের নিষ্ঠা প্রমাণের জন্য অন্য কোনো অজুহাত দেওয়া উচিত নয়। যারা দাবি করেন যে তাঁরা সবার সাথে সমান প্রেম করেন, তাঁদের বোঝা উচিত যে প্রকৃত প্রেমাস্পদ বা অনুরাগীগণ সাধারণের তুলনায় বিশেষ প্রীতির অধিকারী। সবার সাথে সমান প্রেমের চেষ্টা করলে দেখা যাবে যে ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শের কারণে নিজের মূল সিদ্ধান্তটি আর সুপ্রতিষ্ঠিত থাকছে না। ফলস্বরূপ, সবার সাথে তত্ত্ব-বিচার করতে গেলে নিজের ধর্মের সহজাত প্রকৃতির বিরুদ্ধ যুক্তি দিতে হবে, অর্থাৎ অন্যের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে নিজের আদর্শ বিসর্জন দিতে হবে। যাদের অন্তরে শ্রী হরিবংশের নামের প্রতিই প্রেম নেই, তারা তাঁর প্রতিষ্ঠিত এই বিশেষ ধর্মতত্ত্ব হৃদয়ঙ্গম করেছে—তা কীভাবে বিশ্বাস করা যায়?

শ্রীহরিবংশ বচন প্রমাণি কেঁ,
সাকত সঙ্গ সব জু বিসারত।
সন্সৃতি মাজ্ বর্যায়ে কেঁ পাইয়ৌ জু,
মানুষ দেহ বৃথা কৎ ডারত॥
ক্যাঁ ন করে ধরম্মিন কা সাং,
জানি-বুঝি কৎ আন বিবেচার।
যো পৈ ধরম্মী মরম্মী হৌ তৌ,
ধরম্মিন সৌ কৎ অন্তর পারত॥৪॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা: (নিজেকে বৃথা 'ধৰ্মী' মনে করা কিছু উপাসককে সম্বোধন করে সেবক জি বলছেন যে) একদিকে তোমরা শ্রী হরিবংশের বাণীকে প্রামাণিক বলে মানো, আবার অন্যদিকে যাদের উপাসনা ভাগবত ধর্মের সম্পূর্ণ বিপরীত—সেই শক্তি-উপাসকদের সঙ্গে বসে সব আদর্শ ভুলে যাও! হে ভাই, এই দুষ্প্রাপ্য মনুষ্য জন্ম কেন বৃথা নষ্ট করছ? নিজের ধর্মের প্রতি নিষ্ঠা মজবুত করার জন্য কেন স্বধর্মী সাধুদের সঙ্গ করছ না? সব কিছু বুঝেও কেন নিজের আদর্শের বিরুদ্ধ বিষয়ে মন দিচ্ছ? তুমি যদি সত্যিই বুদ্ধিমান ও ধর্মনিষ্ঠ হও, তবে নিজ ধর্মের অনুসারীদের থেকে কেন দূরত্ব বজায় রাখছ?

যো ধরম্মী–ধরম্ম কহ্যৌ জু করুন,
তৌ ধরম্মিন সঙ্গ বড়ৌ সব তেঁ।
অপুনর্ভব স্বর্গ জু নাহিঁ বরাবর,
তৌ সুখ–মর্ত্য কহৌ কব তেঁ॥
কহৌ কাহে প্রমাণ বচন্ন বিসারত,
প্রেমী অনন্য ভয়ে যখন তেঁ।
তব শ্রীহরিবংশ কহি জু কৃপা করি,
সাঁচৌ প্রবোধ শুন্যৌ অব তেঁ॥৫॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা: তুমি যদি শ্রী হরিবংশচন্দ্র জু প্রতিষ্ঠিত 'ধৰ্মী-ধৰ্ম'-এর আদেশ পালন করতে চাও, তবে বুঝে নাও যে সাধুসঙ্গই জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। জাগতিক সুখ তো তুচ্ছ, মুক্তি বা স্বর্গের সুখও সাধুসঙ্গের সমতুল্য নয়। শ্রী হরিবংশের অনুসারী ও অনন্য প্রেমী হয়েও তুমি কেন তাঁর প্রামাণিক বাণীসমূহ ভুলে যাচ্ছ? শ্রী হরিবংশচন্দ্র জু তাঁর জীবদ্দশায় উপাসনা সংক্রান্ত যে সত্য জ্ঞান শ্রী ব্যাসজিকে প্রদান করেছিলেন, তাই তুমি 'এখন' আমার মুখ থেকে শ্রবণ করলে।

শ্রীহরিবংশ জু কহি শ্যাম–শ্যামা,
পদ–কমল–সঙ্গি সির নায়ৌ।
তে ন বচন মানত গুরু দ্ৰোহী,
নিশি–দিন করত আপনৌ ভায়ৌ॥
ইত ব্যৌহার ন উৎ পরমাৰথ,
বীচ হি বীচ জু জনম গঁমায়ৌ।
যো ধর্মিন সোঁ প্ৰীতি করত নহিঁ,
কহা ভবৌ ধর্মী জু কহায়ৌ॥৬॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা: শ্রী হরিবংশচন্দ্র জু (শ্রী ব্যাসজিকে) বলেছিলেন যে, তিনি তাঁর মস্তক শ্রী শ্যামা-শ্যামের চরণাশ্রিত রসিকজনদের চরণে সমর্পণ করেছেন। গুরুদ্রোহীরা এই অমূল্য বাণী অগ্রাহ্য করে এবং দিনরাত কেবল নিজেদের মনের খেয়ালখুশি মতো কাজ করে। এমন ব্যক্তিরা না পারে জাগতিক উন্নতি করতে, না পারে পরমার্থ লাভ করতে। তারা কখনো লোকব্যবহার আর কখনো পরমার্থের পেছনে ছুটে উভয় সংকটে পড়ে নিজেদের অমূল্য জন্ম বৃথা নষ্ট করে। প্রকৃতপক্ষে, যারা স্বধর্মী বা সাধুজনের প্রতি প্রীতি রাখে না, তাদের নিজেদের 'ধর্মনিষ্ঠ' বলে পরিচয় দেওয়া একেবারেই নিরর্থক।

করৌ শ্রীহরিবংশ উপাসক সঙ জু,
প্রীতি–তরঙ সুরঙ বহ্যৌ।
করৌ শ্রীহরিবংশ কি রীতি সবৈ,
কুল–লোক বিরুদ্ধ জু জাই সহ্যৌ॥
করৌ শ্রীহরিবংশ কে নাম সোঁ প্রীতি,
জা নাম–প্রতাপ ধরম্ম লহ্যৌ।
জু ধরম্মী–ধরম্ম স্বরূপ লহ্যৌ,
বিসরৌ জিন শ্রীহরিবংশ কহ্যৌ॥৭॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা: অতএব, তুমি যদি উজ্জ্বল প্রেম-তরঙ্গে অবগাহন করতে চাও, তবে শ্রী হরিবংশ জু-র উপাসকদের সঙ্গ করো। আর যদি তোমার মধ্যে কুলধর্ম ও লোক-ব্যবহারের বিরোধিতা সহ্য করার শক্তি থাকে, তবেই শ্রী হরিবংশ ধর্মের সমস্ত রীতি ভক্তিভরে আচরণ করো। যাঁর প্রতাপে তুমি এই ধর্মের সন্ধান পেয়েছ, সেই শ্রী হরিবংশ নামের প্রতি প্রীতি স্থাপন করো এবং শ্রী হরিবংশচন্দ্র জু নিজের প্রতিষ্ঠিত 'ধর্মী-ধর্ম'-এর যে স্বরূপ বর্ণনা করেছেন, তা কখনোই বিস্মৃত হয়ো না।

শ্রীহরিবংশ–ধরম্ম জে জানত,
প্রীতি কি গ্রন্থি তহিঁ মিলি খুলত।
শ্রীহরিবংশ ধরম্মিন মাজ,
ধরম্মী সুহাত ধরম্ম লাই বলত॥
শ্রীহরিবংশ–ধরম্মী কৃপা করৈঁ,
তাসু কৃপা–রস মাদক ডোলত।
শ্রীহরিবংশ কি বাণী সমুদ্র কৌ,
মীন ভয়ৌ জু আগাধ কলোলত॥৮॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা: সমঝদার উপাসক শ্রী হরিবংশ ধর্মের মর্মজ্ঞ রসিকজনদের সামনেই নিজের প্রেমের পুঁটুলি খোলেন—অর্থাৎ প্রেমের নিগূঢ় অনুভবগুলো কেবল তাঁদের সাথেই আলোচনা করেন। এমন একনিষ্ঠ ভক্ত নিজ ধর্মাবলম্বীদের মাঝেই শোভা পান এবং সর্বদা ধর্মের অনুকূল প্রসঙ্গের অবতারণা করেন। তাঁর এই নির্মল প্রেমে তুষ্ট হয়ে যখন শ্রী হরিবংশীয় ভক্তগণ কৃপা করেন, তখন তিনি সেই কৃপারসে মত্ত হয়ে বিচরণ করেন। সেই কৃপার প্রভাবেই তিনি শ্রী হরিবংশের বাণী-রূপ রস-সমুদ্রের মীন (মাছ) হয়ে তার গভীরতায় পরম সুখে নিমগ্ন থাকেন।

ব্রত সংযম কর্ম সুধরম্ম জিতে,
সব শুদ্ধ বিরুদ্ধ পিছানত হ্যাঁ।
অপনী–অপনী করতূত করৈঁ,
রস মাদক সংক ন আনত হ্যাঁ।
হরিবংশ–গিরা রস–রীতি প্রসিদ্ধ,
প্রতীতি প্রগট্ট প্রমানত হ্যাঁ।
বলিঁ জাউঁ অপনে ধরম্মিন কি,
জে ধরম্মী ধরম্মহিঁ জানত হ্যাঁ॥৯॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা: এই প্রকার একনিষ্ঠ ভক্তগণ ভালোভাবেই বোঝেন যে, যাবতীয় ব্রত, সংযম ও কর্ম তাঁদের শুদ্ধ 'হিত-মার্গের' পরিপন্থী। তাঁরা নিঃসন্দিহে বিশ্বাস করেন যে তাঁদের উপাস্য রস অত্যন্ত মাদক অর্থাৎ প্রেমোন্মাদ সৃষ্টিকারী; আর সেই অনুভব লাভের জন্যই তাঁরা নিজ নিজ ভজন ক্রিয়া চালিয়ে যান। শ্রী হিত চৌরাসী সহ শ্রী হরিবংশের বাণীসমূহে এই রস-রীতি সর্বজনবিদিত। সমঝদার ভক্তগণ এই রস-রীতির প্রতি তাঁদের গভীর বিশ্বাস স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেন। তাই এই 'ধর্মী-ধর্ম' অনুসারী ভক্তদের চরণে আমি নিজেকে উৎসর্গ করছি।

শ্রীহরিবংশ ধরম্ম শুনন্ত জু,
ছাতি সিরাত ধরম্মিন কি।
ধরম্ম শুনন্ত প্রসন্ন হ্বৈ বোলত,
বোলন মিঠি ধরম্মিন কি॥
ধরম্ম শুনন্ত পুলক্কিত রোমন,
হৌঁ বলি প্রেমী ধরম্মিন কি।
জু ধরম্ম শুনায় ধরম্মিঁ যাচ্ছত,
চাহৌঁ কৃপা জু ধরম্মিন কি॥১০॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা: শ্রী হরিবংশের ধর্মকথা শ্রবণ করে একনিষ্ঠ ভক্তদের হৃদয় শীতল হয়। এই ধর্মতত্ত্ব শোনামাত্রই তাঁরা ভক্তসুলভ সহজ ও মিষ্ট ভাষায় আনন্দিত হয়ে কথা বলতে শুরু করেন। আমি সেই সকল প্রেমী ভক্তদের চরণে নিজেকে উৎসর্গ করি, যাঁদের লোমকূপ এই ধর্মকথা শুনে পুলকিত হয়। আমি সেই সকল মহানুভবদের কৃপা প্রার্থী, যাঁরা অন্যকে ধর্মকথা শুনিয়ে নিজেরাও সেই পরম ধর্ম বা ভক্তি লাভের ব্যাকুল প্রার্থনা করেন। অর্থাৎ, তাঁদের ধর্ম আলোচনার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো শুদ্ধ ভক্তি প্রাপ্তি।

শ্রীহরিবংশ প্রসিদ্ধ ধরম্ম সমুঝৈ ন আলপ তপ।
সমুঝৌ শ্রীহরিবংশ-কৃপা সে‌বহু ধরম্মিন জপ॥
ধরম্মী বিনু নহিঁ ধরম্ম নাহিঁ বিনু ধরম্ম জু ধরম্মী।
শ্রীহরিবংশ-প্রতাপ মরম জানহিঁ জে মর্মী॥
শ্রীহরিবংশ নাম ধরম্মী জু রতি, তিন শরণ্য সন্তত রহৈ।
সেবক নিশিদিন ধরম্মিন মিলৈ, শ্রীহরিবংশ সুজস কহৈ॥১১॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা: শ্রী হরিবংশের ধর্ম জগতে সুপ্রসিদ্ধ হলেও অল্প পুণ্যবান বা স্বল্প ভাগ্যবান ব্যক্তি তা বুঝতে পারে না। এই ধর্মকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে হলে শ্রী হরিবংশের কৃপা প্রার্থনা করে তাঁর একনিষ্ঠ ভক্তদের (ধর্মীদের) সেবা ও আরাধনা করতে হয়। কারণ, ভক্ত ছাড়া ধর্মের স্থিতি নেই এবং ধর্ম ছাড়া ভক্তের অস্তিত্ব সম্ভব নয়। শ্রী হরিবংশের প্রতাপে কেবল সূক্ষ্মদর্শী মর্মজ্ঞরাই এই রহস্য বুঝতে পারেন। সেবক জি বলছেন—যে সকল উপাসক শ্রী হরিবংশ নামধারী ভক্তদের প্রতি প্রেম পোষণ করেন, আমি সর্বদা তাঁদেরই শরণাগত। আমি দিনরাত সেই ভক্তদের সঙ্গে মিলিত হয়ে শ্রী হরিবংশের সুযশ কীর্তন করি।

! জয় জয় শ্রীহিত পাকে ধরম্মী প্রকরণ কি জয় জয় শ্রীহিত হরিবংশ !
১৪. শ্রীহিত কাচে ধৰ্মী

Bengali Translation/ Explanation: শ্রীহরিবংশ-ধৰ্ম্মিন কে সঙ,
আগে হি আগে জু রীতি বখনত।
আপুনে জান কহৈ জু মিলৈ মন,
উত্তর ফের চবগ্গুন ঠানত॥
বৈঠত যাই বিধৰ্ম্মিন মে তব,
বাত ধৰ্ম্ম কি একৌ ন আনত।
কাচে ধৰ্ম্মিন কে সুনৌ ছন্দ,
ধৰ্ম্মী ধৰ্ম্ম-মর্ম্ম ন জানত॥১॥

শ্রীহরিবংশ-ধৰ্ম্মিন কে সঙ,
আগে হি আগে জু রীতি বখনত।
আপুনে জান কহৈ জু মিলৈ মন,
উত্তর ফের চবগ্গুন ঠানত॥
বৈঠত যাই বিধৰ্ম্মিন মে তব,
বাত ধৰ্ম্ম কি একৌ ন আনত।
কাচে ধৰ্ম্মিন কে সুনৌ ছন্দ,
ধৰ্ম্মী ধৰ্ম্ম-মর্ম্ম ন জানত॥১॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা: অনেক অপক্ক বা কাঁচা 'ধর্মী' (উপাসক) দেখা যায়, যারা শ্রী হরিবংশ ধর্মের মর্মজ্ঞ ভক্তদের সাথে বসে রস-রীতি আলোচনার সময় তাঁদের কথা বলতে দেয় না। বরং তারা নিজেরাই অগ্রণী হয়ে ধর্মের রীতিনীতি বর্ণনা করতে শুরু করে। এই ধরনের লোকেরা প্রকৃত ভক্তদের প্রথমে বলে যে, "আপনাকে আপনজন মনে করে আপনার সাথে আমার মন মিলে যায়", কিন্তু যখন সেই ভক্তরা কিছু বলতে যান, তখন তারা চারগুণ বেশি কথা শুনিয়ে দেয়। আবার এই লোকেরাই যখন অন্য ধর্মাবলম্বীদের কাছে গিয়ে বসে, তখন তাদের 'হ্যাঁ'-তে 'হ্যাঁ' মেলায় এবং নিজের ধর্মের একটি কথাও উচ্চারণ করে না। সেবক জি বলছেন—এখন আমি এই অপক্ক ভক্তদের 'ছন্দ' অর্থাৎ মনগড়া আচরণের কথা শোনাচ্ছি। এরা আসলে 'ধর্মী-ধর্ম'-এর প্রকৃত রহস্য বা মরম জানে না।

বাতন জূঠন খান কহৈ মুখ,
দেত প্রসাদ অনূঠৌ হি ছাঁড়ত।
গ্রন্থ প্রমান কৈ জো সমঝাইয়ে,
তৌ তব ক্রোধ-রার ফির মা়ড়ত॥
তচ্ছিন ছাঁড়ি প্রেম কি বাতহি,
ফেরি জাতি-কুল-রীতি প্রমানত।
কাচে ধৰ্ম্মিন কে সুনৌ ছন্দ,
ধৰ্ম্মী ধৰ্ম্ম-মর্ম্ম ন জানত॥২॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা: অনেক অপক্ক বা কাঁচা উপাসক অন্য ভক্তদের সামনে বিনয় দেখিয়ে বলেন, "আমি আপনার প্রসাদী উচ্ছিষ্ট (জুঠন) পাওয়ার যোগ্য, তা পেলে আমার পরম ভাগ্য।" কিন্তু এগুলো কেবল মুখের কথা মাত্র। কারণ, ভক্তরা যখন তাঁদের কথা বিশ্বাস করে শ্রীজীর প্রসাদ দেন, তখন তাঁরা তা স্পর্শও করেন না এবং সেই অন্ন অভুক্ত রেখে দেন। যদি শাস্ত্রীয় প্রমাণ দিয়ে তাঁদের বোঝানোর চেষ্টা করা হয় যে, মহাপ্রসাদে কোনো সাধারণ অন্নের ভাব থাকে না, তা এক অপ্রাকৃত ও নিৰ্বিকার বস্তু এবং যে কোনো ভক্তের হাত থেকেই তা গ্রহণ করা যায়—তখন সেই কাঁচা ভক্তরা ক্রুদ্ধ হয়ে বিবাদ শুরু করেন। তাঁরা তৎক্ষণাৎ প্রেমের কথা ভুলে গিয়ে জাতি ও কুলের আভিজাত্য ফলানোর চেষ্টা করেন এবং যুক্তি দেন যে তাঁরা উচ্চ বংশের, তাই নিম্ন বর্ণের কারও হাতের প্রসাদ নিতে পারবেন না। সেবক জি বলেন, আমি এই ধরনের কাঁচা উপাসকদের মনগড়া আচরণের কথা শোনাচ্ছি। এরা আসলে 'ধর্মী-ধর্ম'-এর প্রকৃত রহস্য বোঝে না।

ধৰ্ম্মিন মাাঝ প্রসন্ন হ্যৈ বৈঠত,
জায় বিধৰ্ম্মিন মাাঝ উপাসত।
লালচ লাগি যেখানে যেসে তাহা তেইসে,
সোই-সোই তিন মধ্য প্ৰকাশত॥
বাদহি হত কুম্হার কৌ কুকর,
খালি হৃদৈ গুরু-রীতি ন মানত।
কাচে ধৰ্ম্মিন কে সুনৌ ছন্দ,
ধৰ্ম্মী ধৰ্ম্ম-মর্ম্ম ন জানত॥৩॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা: এই ধরনের অপক্ক বা কাঁচা ভক্তরা হিত-উপাসকদের মাঝে অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গেই মেলামেশা করেন, কিন্তু পরক্ষণেই অন্য ধর্মাবলম্বীদের (বিধর্মী) মাঝে গিয়ে তাঁদের মতোই উপাসনা শুরু করে দেন। প্রকৃতপক্ষে এরা লোভের বশবর্তী হয়ে যেখানে যেমন রং দেখে, সেখানে তেমনই রূপ ধারণ করে। বিধর্মীদের সমাজে গিয়ে তারা তাদের মতোই কথাবার্তা বলতে শুরু করে। এইভাবে তারা অকারণে 'কুম্ভকারের কুকুরের' মতো হয়ে যায় (অর্থাৎ যার নির্দিষ্ট কোনো গন্তব্য বা আশ্রয় নেই)। হৃদয়ে কোনো নিষ্ঠা না থাকার কারণে তারা নিজের গুরু-রীতিকেও মান্য করে না। সেবক জি বলছেন—আমি সেই সব কাঁচা ভক্তদের মনগড়া আচরণের কথা শোনাচ্ছি, যারা 'ধৰ্মী-ধৰ্ম'-এর প্রকৃত রহস্য সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ।

নানা তরঙ্গ করত ছিন হি ছিন,
রোভত রেইন্ট ন লার সম্ভারত।
তচ্ছিন প্রেম জানাই কহন্ত জু,
মেরি সি রীতি কাহে অনুসারত॥
তচ্ছিন ঝগরি রিসায় কহন্ত জু,
মেরি বরাবর অরন মানত।
কাচে ধৰ্ম্মিন কে সুনৌ ছন্দ,
ধৰ্ম্মী ধৰ্ম্ম-মর্ম্ম ন জানত॥৪॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা: কিছু অপক্ক বা কাঁচা ভক্ত ক্ষণে ক্ষণে নানা ধরনের কৃত্রিম লীলা প্রদর্শন করে। নিজের কৃত্রিম প্রেমের আস্ফালন দেখানোর জন্য যখন তারা কাঁদতে শুরু করে, তখন তারা এমনকি নিজেদের নাক ও মুখের লালা-ও সামলায় না (অত্যধিক প্রদর্শনী বোঝাতে)। যদি কেউ তাদের এই কান্না দেখে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে, তবে তারা তৎক্ষণাৎ বলতে শুরু করে, "ভাই! এ তো প্রেমের উচ্চ অবস্থা, তুমি কেন আমাকে অনুকরণ করছ?" আবার যদি কেউ তাদের বলে যে, "অমুক মহাত্মাও আপনার মতোই বড় প্রেমিক", তবে তারা তৎক্ষণাৎ ক্রুদ্ধ হয়ে বিবাদে জড়িয়ে পড়ে এবং বলে—"তুমি অন্য সাধারণ মানুষকে আমার সমান মনে করো!" সেবক জি বলছেন—আমি এই ধরণের মনগড়া আচরণকারী উপাসকদের কথা শোনাচ্ছি, যারা 'ধর্মী-ধর্ম'-এর প্রকৃত রহস্য বা মরম জানে না।

মেরৌ সউ প্রেম, মেরৌ সউ কীরতন,
মেরি সি রীতি কাহে অনুসারত।
মেরৌ সউ গান, মেরৌ সউ বাজাইবৌ,
মেরৌ সউ কৃত্য সবই জু বিসারত॥
ছাঁড়ি মর্জাদ গুরুন্ন সউ বলত,
কঞ্চন-কাঁচ বরাবর মানত।
কাচে ধৰ্ম্মিন কে সুনৌ ছন্দ,
ধৰ্ম্মী ধৰ্ম্ম মর্ম্ম ন জানত॥৫॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা: এই কাঁচা বা অপক্ক ভক্তরা অন্য উপাসকদের অহংকারের সঙ্গে বলে— "তোমরা কেন আমার মতো প্রেম করো না? কেন আমার মতো কীর্তন বা আমার ভজন পদ্ধতি অনুসরণ করো না? কেন তোমরা আমার মতো গান, বাজনা এবং আমার আচার-আচরণকে গুরুত্ব দিচ্ছ না?" এমন অভিমানী ব্যক্তিদের যখন তাদের গুরুদেব বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, প্রকৃত প্রেমিক কখনোই নিজের প্রেমের কথা অন্যের কাছে জাহির করে না, তখন এই কাঁচা ভক্তরা সমস্ত মর্যাদা বিসর্জন দিয়ে গুরুর সাথেই তর্কে লিপ্ত হয়। তারা সোনা আর কাঁচকে এক সমান মনে করে—অর্থাৎ, তারা নিজের গুরুদেবকেও সাধারণ মানুষের মতো তুচ্ছ জ্ঞান করে। সেবক জি বলছেন—আমি এই ধরণের মনগড়া আচরণকারী ব্যক্তিদের কথা শোনাচ্ছি, যারা 'ধর্মী-ধর্ম'-এর প্রকৃত রহস্য বোঝে না।

দেখে জু দেখে ভলে জু ভলে তুমি,
আপনৌ অর পরায়ৌ ন জানত।
হৌ জু সদা রস-রীতি বখানত,
মেরি বরাবর ঠাগন মানত॥
কাইসে ধৌঁ পাওঁ তিহারে হৃদৈ কৌঁ
আন দ্বার কে মমি ন জানত।
কাচে ধৰ্ম্মিন কে সুনৌ ছন্দ,
ধৰ্ম্মী ধৰ্ম্ম-মর্ম্ম ন জানত॥৬॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা: এই কাঁচা ভক্তদের বিপরীত আচরণ দেখে যদি কোনো প্রকৃত ভক্ত তাঁদের বোঝানোর চেষ্টা করেন, তবে তারা উল্টো তাকেই আক্রমণ করে বলে— "তোমাকে আমার ভালোই চেনা আছে যে তুমি কত বড় ভালো মানুষ! তোমার আপন-পর চেনার জ্ঞান নেই। আমি তো সদা শ্রী হিত জু মহারাজের 'রস-রীতি' ব্যাখ্যা করে চলি, আর তুমি কি না আমার তুলনা করো ভণ্ডদের সাথে? তুমি তাদের আমার সমান মনে করো!" তারা আরও বলে, "অন্য সম্প্রদায়ের (অন্য দ্বারে) লোক আমার স্বরূপ চিনতে না পারলে না-ই চিনুক, কিন্তু তোমার মতো ভক্তের হৃদয়েও কেন আমার স্থান হচ্ছে না, তা আমি বুঝতে পারছি না।" সেবক জি বলছেন—আমার কাছে সেই সব ভক্তদের কৃত্রিম বা বানাবটি কথার বিবরণ শোনো, যারা 'ধৰ্মী-ধৰ্ম'-এর প্রকৃত রহস্য বোঝে না।

অর তরঙ্গ সুনৌ অতি মীঠী,
সখীন কে নাম পরস্পর বলত।
তচ্ছিন কেশ গহন্ত মু্ষ্টি হনি,
সাকত শুদ্ধ বচাভত ডোলত॥
তচ্ছিন বলৈঁ তু প্রেত, তু রাক্ষস,
ফেরি পরস্পর জতি প্রমাণত।
কাচে ধৰ্ম্মিন কে সুনৌ ছন্দ,
ধৰ্ম্মী ধৰ্ম্ম-মর্ম্ম ন জানত॥৭॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা: এবার এই কাঁচা ভক্তদের একটি অত্যন্ত 'মিষ্টি তরঙ্গ' (এমন আচরণ যা শুনলে হাসি পায়) শুনুন। এই লোকেরা নিজেদের নাম ললিতা, বিশাখা প্রভৃতি সখীদের নামে রেখেছে এবং একে অপরকে এই নামেই সম্বোধন করে। কিন্তু যখনই নিজেদের মধ্যে মনোমালিন্য হয়, তখন তারা একে অপরের চুল ধরে ঘুষোঘুষি শুরু করে দেয়! অবস্থা এতটাই চরমে পৌঁছায় যে, যেসব শাক্তদের (শক্তি উপাসক) তারা সারাদিন নিন্দা করে, সেই শাক্তরাই এসে তাদের ঝগড়া থামাতে বাধ্য হয়। যখন শাক্তরা মাঝখানে এসে তাদের আলাদা করে দেয়, তখন তারা দূরে দাঁড়িয়ে একে অপরকে 'রাক্ষস', 'প্রেত' বলে গালিগালাজ করতে থাকে। এমনকি তারা তখন সখী-ভাব ভুলে গিয়ে জাত-পাত নিয়ে টানাটানি শুরু করে দেয়— "তুই শূদ্র, আমি ব্রাহ্মণ" ইত্যাদি। সেবক জি বলছেন—আমি এই ধরনের ভক্তদের কৃত্রিম আচরণের কথা শোনাচ্ছি, যারা 'ধর্মী-ধর্ম'-এর প্রকৃত রহস্য সম্পর্কে বিন্দুমাত্র জানে না।

জান্যৌ ধৰ্ম্ম দেখী রস-রীতি জু,
নিষ্ঠুর বলত বদান প্ৰকাশিত।
আইসে নাইসে রেহে মঁঝরেইঢব,
পাছিলিয়ৌ জু করি নিৰভাসিত।
হ্বৈ হ্যঁ ফেরি যেসে কে তেসে হম,
বারে তে আয়ে সন্যাসিন মানত।
কাচে ধৰ্ম্মিন কে সুনৌ ছন্দ,
ধৰ্ম্মী ধৰ্ম্ম-মর্ম্ম ন জানত॥৮॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা: যদি কোনো প্রকৃত নিষ্ঠাবান ভক্ত এই কাঁচা উপাসকদের এমন আচরণ দেখে তাঁদের বুঝিয়ে সুপথে আনার চেষ্টা করেন, তবে ক্রোধে তাঁদের মুখ লাল হয়ে যায়। তাঁরা অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে সেই নিষ্ঠাবান ভক্তদের বলেন— "তোমাদের ধর্মও আমাদের দেখা আছে আর তোমাদের 'রস-রীতি'ও দেখা আছে!" সেবক জি বলছেন—এই ধরনের আচরণকারী কাঁচা ভক্তরা না পারল সংসারী হতে, না পারল প্রকৃত ভজনানন্দী হতে; তারা মাঝপথেই আটকে গেল। এমনকি তারা 'ধৰ্মী' হওয়ার আগের নিজেদের আদিম অবস্থাও জাহির করে ফেলে এই বলে যে— "আমরা ছোটবেলা থেকেই সন্ন্যাসীদের মেনে আসছি, প্রয়োজনে আবার আগের মতোই হয়ে যাব (অর্থাৎ সন্ন্যাসীদেরই মানতে শুরু করব)।" সেবক জি বলেন, আমি এই ধরনের কাঁচা ভক্তদের কৃত্রিম আচরণের কথাই শোনাচ্ছি, যারা 'ধৰ্মী-ধৰ্ম'-এর প্রকৃত রহস্য বোঝে না।

এক রিসানে সে রূখে-সে দিখত,
পূছত রীতি ভভুকত ধাবত।
এক রঙমগে বলত চালত,
মামিলেহু বপুরে জু জানাবত॥
এক বদন্ন কে সাঁচী-সাঁচী কহঁ,
চিত্ত সত্যাই কী একৌ ন আনত।
কাচে ধৰ্ম্মিন কে সুনৌ ছন্দ,
ধৰ্ম্মী ধৰ্ম্ম-মর্ম্ম ন জানত॥৯॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা: এক ধরণের কাঁচা ভক্ত আছে যারা সর্বদা ক্রুদ্ধ ও রুক্ষ মেজাজে থাকে। যদি কেউ তাদের কাছে ধর্মের রীতি সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন করে, তবে তারা সোজা উত্তর দেওয়ার পরিবর্তে আগুনের মতো জ্বলে ওঠে এবং তাকে গালিগালাজ বা মন্দ কথা বলতে শুরু করে। আবার অন্য এক ধরণের লোক আছে যাদের অন্তরে 'হিত-ধর্মের' লেশমাত্র নেই, কিন্তু বাইরে তাদের কথাবার্তা অত্যন্ত প্রেমপূর্ণ বা অনুরাগের রঙে রাঙানো থাকে। এই হতভাগ্যরা (রঙ্ক) কথা বলার সময় এমন দাপট বা 'মামলতদারি' দেখায় যেন তারা কোনো উচ্চ পদে আসীন। আবার কিছু লোক মুখে ধর্মের বড় বড় সত্য কথা বলে—যেন তারা পরম অনন্য রসিক; কিন্তু বাস্তবে তাদের মনের মণিকোঠায় সত্যের ছিটেফোঁটাও নেই। সেবক জি বলছেন—এই ধরণের কাঁচা ভক্তদের কৃত্রিম আচরণের কথা শোনো, যারা 'ধর্মী-ধর্ম'-এর প্রকৃত রহস্য জানে না।

এক ধৰ্ম্ম সমুজ্জে বিনাভ,
গুসাঁই কে হ্যৈ জু জগত পূজাভত।
মূল ন মন্ত্ৰ টটোরা কী রীতি,
ধৰ্ম্মিন পুছত বদন দুরাভত।
এক মূলম্মা সউ দেত উঘার জু,
বল্লভ-সউ-বল্লভ- পরমানত।
কাচে ধৰ্ম্মিন কে শুনৌ ছন্দ,
ধৰ্ম্মী ধৰ্ম্ম- মরম্ম ন জানত॥১০॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা: এক প্রকার কাঁচা ধর্মী আছে যারা ধর্ম সম্পর্কে প্রকৃত কিছু জানে না, কিন্তু গুসাঞী জীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে অর্থাৎ তাঁর কাছ থেকে দীক্ষা নিয়ে সেই বল প্রয়োগ করে জগতে পূজিত হওয়ার চেষ্টা করে। এদের 'হিত-ধর্মের' মূল মন্ত্র বা মূল রহস্যের কোনো প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নেই; এরা অন্ধের মতো হাতড়ে অর্থাৎ এদিক-ওদিক থেকে কিছু কথা সংগ্রহ করে কোনোমতে কাজ চালিয়ে নেয়। এর ফলে যখন কোনো বিজ্ঞ উপাসক তাদের কোনো নিগূঢ় প্রশ্ন করেন, তখন তারা মুখ লুকিয়ে বেড়ায়। আবার এক প্রকার লোক আছে যারা হিত-ধর্মের 'রস-রীতি' বর্ণনা করার সময় এমনভাবে কথা বলে যেন কোনো উজ্জ্বল পালিশ করা বস্তু থেকে পালিশ তুলে ফেলে তার আসল জৌলুসহীন রূপটি বের করছে। তারা শ্রীরাধা-বল্লভের অপ্রাকৃত প্রেমকে জাগতিক প্রেমিক-প্রেমিকাদের কামজ প্রেমের মাধ্যমে প্রমাণ করার ধৃষ্টতা দেখায়। সেবক জি বলছেন—আমি এই প্রকার কাঁচা উপাসকদের কৃত্রিম আচরণের পরিচয় দিচ্ছি, যারা 'ধর্মী-ধর্ম'-এর প্রকৃত রহস্য জানে না।

এক গুরুন্ন সউবাদ করন্ত,
জু পণ্ডিত-মানি হ্যৈ জিভহি আইঁঠত।
এক দরব্ব কে জোর বরব্বট,
আসন চাঁপি সভা মধ্যি বসন্ত।
এক জু ফেরি রীতি উপদেশত,
এক বড় হ্যৈ ন বাত প্রমাণত।
কাচে ধৰ্ম্মিন কে শুনৌ ছন্দ,
ধৰ্ম্মী ধৰ্ম্ম- মরম্ম ন জানত॥১১॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা: এক প্রকার কাঁচা উপাসক আছে যারা হিত-ধর্মের কোনো বিশেষ সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজের গুরুজনদের সাথেই বিবাদে জড়িয়ে পড়ে এবং নিজেকে বড় পণ্ডিত মনে করে তাঁদের সামনেই কুটিল ও অহংকারী কথা বলে। আবার কেউ কেউ কেবল ধনের দম্ভে রশিকজনদের সভায় জোরপূর্বক গুরুজনদের সমান আসনে বা তাঁদের নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে বসে পড়ে। কিছু লোক এমনও আছে যারা হিত-ধর্মের পবিত্র 'রস-রীতি'কে নিজের ইচ্ছামতো পরিবর্তন করে তার ভুল উপদেশ দিয়ে থাকে। আবার একদল আছে যারা নিজেদের 'পুরানো ভক্ত' বলে মনে করে অহংকার করে এবং অন্য কারও সঠিক কথাকেও গ্রাহ্য করে না। সেবক জি বলছেন—আমি এই প্রকার কাঁচা উপাসকদের মনগড়া আচরণের কথা শোনাচ্ছি, যারা 'ধৰ্মী-ধৰ্ম'-এর প্রকৃত রহস্য বা মরম জানে না।

এক ধৰ্ম্মী অনন্য কহাই,
বড়াই কউ ন্যারি য়ে বাজী-সই মাঁড়ত।
অউর কে বাপ সউ বাপ কহন্ত,
দরব্ব কে কাজ ধৰ্ম্মহি ছাঁড়ত।
বোলত বোল বটাউ সই লাগত,
হ্যৈ গুরুমানি ন বাত প্রমাণত।
কাচে ধৰ্ম্মিন কে শুনৌ ছন্দ,
ধৰ্ম্মী ধৰ্ম্ম-মরম্ম ন জানত॥১২॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা: এক প্রকার কাঁচা উপাসক আছে যারা নিজেদের 'অনন্য ভক্ত' বলে পরিচয় দেয়, কিন্তু বাস্তবে তারা কেবল যশের কাঙাল; লোকসমাজে বড়াই পাওয়ার জন্য তারা জান লড়িয়ে দেয় এবং সামান্য খ্যাতিকেই জীবনের বড় প্রাপ্তি বলে মনে করে। আবার অর্থের লোভে পড়ে তারা নিমেষের মধ্যে নিজের ধর্ম বিসর্জন দিতেও প্রস্তুত থাকে এবং প্রয়োজনে নিজেদের অন্য সম্প্রদায়ের অনুসারী বলে পরিচয় দিতে শুরু করে। এই লোকেরা যখন অন্য সত্যিকারের ভক্তদের (ধর্মীদের) সাথে কথা বলে, তখন এমন ভাব দেখায় যেন কোনো অপরিচিত পথিকের সাথে কথা বলছে। তারা নিজেদের 'গুরুত্ব' বা শ্রেষ্ঠত্বের অভিমানে মত্ত থাকে এবং অন্য কারও যুক্তিপূর্ণ বা প্রামাণিক কথাকে বিন্দুমাত্র গ্রাহ্য করে না। সেবক জি বলছেন—আমি এই সব কাঁচা ভক্তদের কৃত্রিম আচরণের কথা শোনাচ্ছি, যারা 'ধর্মী-ধর্ম'-এর প্রকৃত রহস্য বা মরম জানে না।

পরখে শুনহু সুজান, যেখানে কছু অউর কচাই।
ভক্ত কহৈ পরসন্ন, নতরু তা কহৈ বুরবাই।
দিয়ে সরাহৈ সুখ রহৈ, দুখ মে দিন রাতী।
খৈবে কউ জু সাজাতি, খরচ কউ হউত বিজাতি॥১৩॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা: হে বিজ্ঞ পাঠকগণ! এই অপক্ক বা কাঁচা ভক্তদের মধ্যে আমি আরও যে ধরণের খামতি বা কাঁচা ভাব লক্ষ্য করেছি, তা এবার শুনুন। কেউ যদি এদের 'ভক্ত' বলে সম্বোধন করে, তবে এরা খুব খুশি হয়। কিন্তু যদি এদের ভুল ধরিয়ে দিয়ে অন্য কোনো গঠনমূলক কথা বলা হয়, তবে এরা খুব অপমানিত বোধ করে। এই ধরণের লোকেরা সাধারণত দিনরাত মনের দুঃখে ভুগে থাকে; কেবল যখন কেউ এদের কিছু উপহার দেয় বা এদের তোষামোদ করে প্রশংসা করে, তখনই এরা আনন্দ পায়। খাবারের নিমন্ত্রণ থাকলে এরা নিজেদের 'একই পরিবারের লোক' (সজাতীয়) বলে পরিচয় দেয়, কিন্তু যখন কোনো কাজে খরচ করার বা দায়িত্ব নেওয়ার কথা ওঠে, তখন এরা অম্লানবদনে নিজেদের 'বাইরের লোক' (বিজাতীয়) হিসেবে জাহির করে।

লাই উপদেশ কহায় অনন্য,
অনহাই অনর্পিত যাই গটক্কত।
আস করৈ বিষয়ীন কে আগৈ,
জু দেখে মই জোরত হাত লটক্কত॥
কেতিক আয়ু, কিতেক সউ জীবন,
কাহে বিনাসত কাজ হটক্কত।
শ্রীহরিবংশ ধৰ্ম্মিন ছাঁড়ি,
ঘর-ঘর কাহে ফিরত ভটক্কত॥১৪॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা: কিছু কাঁচা উপাসক এমন আছেন যারা গুরুর কাছে উপদেশ নিয়ে নিজেদের 'অনন্য ভক্ত' বলে পরিচয় দেন ঠিকই, কিন্তু স্নান সেরেই শ্রী হরি বা গুরুকে নিবেদন না করে (ভোগ না লাগিয়ে) আহার গ্রহণ করেন। এই লোকেরা বিষয়াসক্ত জাগতিক মানুষের কাছে অনেক কিছু আশা করে এবং আমি এদের বিষয়ী ব্যক্তিদের সামনে অত্যন্ত দীনভাবে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি। হে ভাই! মানুষের আয়ু আর কতটুকুই বা, আর তার এই জীবনই বা কতদিনের? তবে কেন এই অমূল্য সময় সৎকর্ম ছাড়া অন্য কাজে ব্যয় করছ? শ্রী হরিবংশের খাঁটি ভক্তদের সঙ্গ ত্যাগ করে কেনই বা তোমরা অকারণে মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে বেড়াচ্ছ?

সাকত সংগ অগ্নিন-লপট্ট,
লপট্ট-জরত্ত ক্যৌ সংগতি কিজৈ।
সাধু সুবুদ্ধি সমান সু সত্ন,
জানিকৈ শীতল সংগতি কিজৈ॥
এক জু কাচে প্রকৃতি-বিরুদ্ধ,
প্রকৃতি বিরুদ্ধ করৈ তৌ কা কিজৈ।
জে আগৈ কে দাঝে গইয় ভজি পানী মে,
পানী মে আগ লাগৈ তৌ কা কিজৈ॥১৫॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা: শক্তি উপাসকদের সঙ্গ (অর্থাৎ সাধারণ বিষয়াসক্ত এবং ভগবদ্-বিমুখ ব্যক্তিদের সঙ্গ) আগুনের লেলিহান শিখার মতো দহনকারী। বুদ্ধিমান ব্যক্তির উচিত এমন দহনকারী ও অত্যন্ত কষ্টদায়ক সঙ্গ পরিহার করা। এর পরিবর্তে, নির্মল বুদ্ধিবিশিষ্ট, বৈষম্যহীন এবং সৎ চরিত্রের অধিকারী সাধু-সন্তদের চিনে নিয়ে তাঁদের শীতল সঙ্গ গ্রহণ করা উচিত, যা হৃদয়কে প্রশান্ত করে। কাঁচা ভক্তরা এমনিতেই 'হিত-ধর্ম'-এর বিরুদ্ধ স্বভাবের অধিকারী হয়; তারা যদি এই ধর্মের মূল প্রকৃতির বিরুদ্ধে আচরণ করে, তবে তার প্রতিকার কী? তাদের অবস্থা সেই ব্যক্তির মতো, যে আগুন থেকে বাঁচতে জলের শরণাপন্ন হয়, কিন্তু যখন সেই জলেও আগুন লেগে যায় তখন সে সেখানেও দগ্ধ হতে থাকে। তাৎপর্য এই যে, কাঁচা ভক্তরা সংসারের দাবানল থেকে বাঁচতে পরম শীতল 'শ্রী হিত-ধর্ম'-এর আশ্রয় নেয় ঠিকই, কিন্তু নিজেদের কলুষিত ও বিরুদ্ধ প্রকৃতির কারণে সেখানেও অশান্তির আগুন জ্বালিয়ে তাতে নিজেরাই পুড়তে থাকে।

প্রীতি-ভং গরনত রস-রীতিহি,
শ্রীহরিবংশ বচন বিসরাভহু।
আপ আপনি ঠৌর যেখানে তাহঁ,
করি বিরুদ্ধ সব প্যৈ নিংদরাভহু॥
এক সংসার দুষ্ট কি সংগতি,
তাহঁ প্যৈ তুমি পুষ্ট করাভহু।
বিনতি করহুঁ সকল ধৰ্মিন সোঁ,
ধৰ্মী হ্ই জিন নাম ধরাভহু॥১৬॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা: তোমরা মুখে তো এই প্রেম ধর্মের রীতিনীতি বর্ণনা করো, কিন্তু তোমাদের অন্তরে প্রীতির লেশমাত্র নেই। এইভাবে তোমরা শ্রী হরিবংশচন্দ্র জুর সেই অমর বাণী— 'সব সৌঁ হিত' (সবার সাথে হিত বা মঙ্গল আচরণ করো)—ভুলে যাচ্ছ। ভক্তরা যে যাঁর নিজের স্থানে অর্থাৎ নিজ নিজ সম্প্রদায়ের মতাদর্শে স্থিত আছেন। তোমরা তাঁদের সিদ্ধান্ত ও বিশ্বাসকে অহেতুক বিরোধ বা সমালোচনা করে তাঁদের কাছে নিজেদের এবং নিজেদের ধর্মের নিন্দা ও অপমান ডেকে আনছ। এমনিতেই মানুষ এই দুষ্ট জগতের সঙ্গ সহজাতভাবেই লাভ করেছে (অর্থাৎ এই সংসারে জন্ম নিয়েছে), তার ওপর আবার কলুষিত আচরণ করে তোমরা এই জগতের দুষ্টতাকেই আরও পুষ্ট করছ। সেবক জি বলছেন—আমি সকল ভক্তের কাছে প্রার্থনা করছি যে, তোমরা 'ধর্মী' বা উপাসক হয়ে ধর্মের দুর্নাম করো না।

স্বার্থ সকল তজি, গুরু চরণন ভজি,
গুন-নাম শুনি কহি, সনতন সোঁ সংগ করি।
কাল-ব্যাল মুখ পরয়ৌ, কফ বাত পিত্ত ভরয়ৌ,
ভ্রম্যৌ কত অনন্য কহে কী জিয় লাজ ধরি॥
সেবক নিকট রস রীতি প্রীতি মন ধরি,
হিত হরিবংশ কুল-কানি সব পৰিহরি।
কাচে রসিকন সোঁ বিনতি করত ঐসী,
গোবিন্দ দুহাই ভাই জো ন সেবৌ শ্যামা-হরি॥১৭॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা: তোমরা অন্য সকল স্বার্থমাখা সাধন পরিত্যাগ করে শ্রী গুরুর চরণ ভজনা অর্থাৎ সেবা করো; শ্যামা-শ্যামের নাম ও গুণের শ্রবণ ও কীর্তন করো এবং রসিক সন্তদের সঙ্গ করো। তোমার এই শরীর কফ, বায়ু আর পিত্তে পরিপূর্ণ (অর্থাৎ নশ্বর) এবং তুমি কাল রূপী সর্পের মুখে অবস্থান করছ। এই ধ্রুব সত্য জানার পরেও কেন তুমি ভ্রমের জালে জড়িয়ে আছ? নিজেকে 'অনন্য ভক্ত' পরিচয় দিয়েও তোমার মনে লোকলজ্জা বা ভয় নেই কেন? সেবক অর্থাৎ পাকা ও নিষ্ঠাবান ভক্তদের সান্নিধ্যে থেকে শ্রী হিত হরিবংশের রস-রীতি ও প্রেমে নিজের মনকে নিবিষ্ট করো এবং কুলের যাবতীয় লৌকিক মর্যাদা ত্যাগ করো। আমি তোমাদের মতো কাঁচা রসিকদের কাছে এই প্রার্থনা করছি— হে ভাই! তোমাদের শ্রী গোবিন্দের শপথ, যদি তোমরা শ্রী শ্যামা-হরির সেবা ও আরাধনা না করো (তবে তোমাদের জীবন বৃথা)।

প্রগটিত শ্রীহরিবংশ সুর দুন্দুভি বজাই বল।
মদন মোহ মদ মলিত নিদরি নির্দলিত দম্ভ-দল॥
ভ্রম ভাগ্য ভয়-ভীত, গর্ব দূর্জন রজ খণ্ডন।
লোভ-ক্রোধ-কলি-কপট, প্রবল পাখণ্ড বিহন্ডন॥
তৃষ্ণা-প্রপঞ্চ-মৎসর-বিসন, সর্ব দণ্ড নির্বল করে।
শুভ-অশুভ দুর্গ বিধ্বংসি বল, তখন জৈতি-জৈতি জগ উচ্চরে॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা: তোমার সৌভাগ্যে শ্রী হরিবংশ রূপী যোদ্ধা নিজের অসীম শক্তি ও সামর্থ্যের দুন্দুভি বাজিয়ে এই পৃথিবীতে প্রকট হয়েছেন। অর্থাৎ, পৃথিবীতে প্রেমের অবতার নিজের তেজোময় প্রভাব বিস্তার করে আবির্ভূত হয়েছেন। এই যোদ্ধা কোন শত্রুদের জয় করেছেন? তার উত্তর দিতে গিয়ে সেবক জি বলছেন—তিনি কাম এবং মোহের দম্ভকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছেন এবং দম্ভ ও পাষণ্ডের (ভণ্ডামি) দলকে চরম অপমানের সাথে পদদলিত করেছেন। এই যোদ্ধার দর্শন মাত্রই 'ভ্রম' বা মোহগ্রস্ততা ভীত হয়ে পলায়ন করেছে। তিনি অহংকার রূপী দুর্জনের রজোগুণকে খণ্ডিত করেছেন এবং কলিকালের প্রভাবে উৎপন্ন লোভ, ক্রোধ, কপটতা ও প্রবল ভণ্ডামিকে টুকরো টুকরো করে দিয়েছেন। এই মহাবীর যোদ্ধা তৃষ্ণা, প্রপঞ্চ, মাৎসর্য (হিংসা) ও ব্যসনের (কুভ্যাস) সমগ্র বাহিনীকে হীনবল বা শক্তিহীন করে দিয়েছেন এবং শুভ-অশুভ রূপী কেল্লাকে বলপূর্বক ধ্বংস করে জগতে নিজের জয়জয়কার ধ্বনিত করেছেন।

! জয় জয় শ্রীহিত কাচে ধর্মী প্ৰকরণ কী জয় জয় শ্রীহরিবংশ !

১৫. শ্রীহিত অলভ্য লাভ

হরিবংশ নাম হ্য জাহাঁ তাহাঁ-তাহাঁ উদারতা,
সকামতা তাহাঁ নাহি কৃপালুতা বিশেষিয়ে।
হরিবংশ নাম লীন জে অজাতশত্রু তে সাদা,
প্রপঞ্চ দম্ভ আদি দে তাহাঁ কছু ন পেখিয়ে।
হরিবংশ নাম জে কহ্যাঁ, অনন্ত সুক্ক তে লহ্যাঁ,
দুরাপ প্রেম কী দশা, তাহাঁ প্রতক্ষ দেখিয়ে।
সই অনন্য সাধু সও জগত পূজিয়ে সাদা,
সু ধন্য-ধন্য বিশ্ব মে জনম্ম সত্য লেখিয়ে ॥১॥


Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - যাদের হৃদয়ে শ্রী হরিবংশ নামের প্রকাশ বিশুদ্ধ তৎসুখময় প্রেমরূপে বিরাজমান, তাদের মধ্যে সহজাত উদারতা ও কৃপালুতা দেখা যায় এবং কোনো সকামতা থাকে না। যারা শ্রী হরিবংশ নামে মগ্ন অর্থাৎ শ্রী হরিবংশ নাম যাদের রোমে রোমে পূর্ণ হয়েছে, তারা কাউকেই শত্রু গণ্য করেন না এবং তাদের মধ্যে প্রপঞ্চ-পাখণ্ড কিছু দেখা যায় না। যারা শ্রী হরিবংশ নাম জপ করেন তারা স্থায়ী সুখ লাভ করেন এবং তাদের মধ্যে দুর্লভ প্রেমের বিভিন্ন দশা—গদগদ, রোমাঞ্চ, অশ্রু ইত্যাদি—প্রত্যক্ষভাবে দেখা যায়। এমন উপাসকই জগতের দ্বারা সর্বদা পূজিত অনন্য সাধু হন। সংসারে তাদেরই জন্ম নেওয়া সার্থক ও ধন্য।

হরিবংশচন্দ্র জো কহি সুচিত্ত হ্ব্য সবই লহি,
বচন্ন চারু মাধুরি সু প্রেম সঁ পিছোনিয়ে।
সুনৈ প্রপন্ন জে হ্যঅভদ্র সবর কে গয়ে,
তিনহেঁ মিলে প্রসন্ন হ্ব্য ন জাতি-ভেদ মানিয়ে।
সুভাগ-লাগ পাই হৌ, প্রসংশ কণ্ঠ লায় হৌ,
সিরায় নঁন দেখি কেঁ, অভেদ বুদ্ধি আনি ইয়েঁ।
কৃপালু হ্ব্য সু ভাখি হ্যঁ ধরম্ম পুষ্ট রাখি হ্যঁ,
শ্রিভ্যাসানন্দ নাম কঁ আলভ্য লাভ জানিয়ে ॥২॥


Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - শ্রী ব্যাসানন্দ (শ্রী হরিবংশচন্দ্র জু) নামের লাভ অলভ্য (অতি দুর্লভ) বলে জানা উচিত। যেসব উপাসক এই নামের আশ্রয় নিয়েছেন, তারা শ্রী হরিবংশচন্দ্র জু-র সম্পূর্ণ আজ্ঞা একাগ্র চিত্তে গ্রহণ করেছেন অর্থাৎ নিজেদের আচরণ তাঁর আজ্ঞার অনুকূল করেছেন এবং শ্রী হরিবংশের বাণীর সুন্দর মাধুর্যকে এই বাণীর প্রতি তাদের অত্যধিক প্রেম দেখে চেনা উচিত। যারা এই বাণী শুনে শ্রী হরিবংশচন্দ্র জু-র শরণাপন্ন হয়েছেন, তাদের সকলের অমঙ্গল দূর হয়েছে। এমন রসিকজনদের সাথে প্রসন্নচিত্তে মেলা উচিত এবং তাদের সাথে জাতিভেদ মানা উচিত নয়। প্রবল ভাগ্যের ফলে এমন প্রেমী উপাসকদের দেখা পেলে তাদের ভজনের প্রশংসা করে আলিঙ্গন করা উচিত এবং তাদের দর্শনে নিজের নেত্র শীতল করে ভেদাভেদহীন বুদ্ধি রাখা উচিত। এমন করলে তারা কৃপাদ্রব হয়ে ভজনের রীতি বলে দেবেন এবং তোমার ধর্মকে পুষ্ট রাখবেন। এ সবই শ্রী ব্যাসানন্দ নামের অলভ্য লাভ বলে জানা উচিত।

হরিবংশ নাম সর্ব সার ছাঁড়ি লেত বহুত ভার,
রাজ- বিভৌ দেখি কেঁ বিষৈ-বিষম্ম ভবহেঁ।
জোরু হ্যঁত সাধু সঁগ আনি করত প্রীতি ভং,
মান-কাজ রাজসীন কে জু মুক্ক জবহেঁ।
যহাঁ তহাঁ অন্ন খাত, সখী কহত আপ গাত,
সবক দ্যৌস দ্বন্দ জাত রাত সবর সোভহেঁ।
প্রসিদ্ধ ভ্যাসানন্দ নাম জানি-বুজি ছোড়হেঁ,
প্রমাদ তঁ লিয়ে বিনা জনম্ম বাদ খোভহেঁ ॥৩॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - (এখন দুটি ছন্দে শ্রী হরিবংশ বিমুখ ব্যক্তিদের করুণ পরিস্থিতি বর্ণনা করে সেবক জি বলছেন যে) সর্বসার রূপ শ্রী হরিবংশ নাম ত্যাগ করে এই বিমুখ ব্যক্তিরা নিজেদের মাথায় অনেক অসাড় বোঝা চাপিয়ে নেয় এবং সংসারী মানুষের রাজবৈভব দেখে দুর্লভ বিষয় ভোগে মন দেয়। যদি এই লোকেদের কখনও সাধু সঙ্গ লাভ হয়, তবে তারা তাদের সাথে অনুচিত ব্যবহার করে প্রীতি ভঙ্গ করে এবং সম্মান পাওয়ার আশায় ধনবান ব্যক্তিদের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে। এই লোকেরা নিজেদের শরীরকে সখী রূপ বলে দাবি করে এবং যেখানে সেখানে অন্ন খেয়ে বেড়ায়। এদের সম্পূর্ণ দিন রাগ-দ্বেষ আদি দ্বন্দ্বে অতিবাহিত হয় এবং সারা রাত ঘুমিয়ে কাটায়। এরা প্রসিদ্ধ প্রভাবশালী শ্রী ব্যাসানন্দন নাম জেনে-বুঝে ত্যাগ করে এবং প্রমাদহীন মনে তা গ্রহণ না করে নিজেদের জন্ম বৃথা নষ্ট করে।

হরিবংশ নাম হীন খীন দীন দেখি এ সাদা,
কহা ভয় হ্যঁ বহুজ্ঞ হ্ব্যঁ পুরাণ বেদ পড়্ধহেঁ।
কহা ভয় হ্যঁ ভ্যঁ প্রবীণ জানি মানিয়েঁ জগত্ত,
লোক রীঝি শোভ কঁ বানাই বাত গঢ়্ধহেঁ।
কহা ভয় হ্যঁ किए করম্ম জজ্ঞ দান দেত দেত,
ফলন পাই উচ্চ উচ্চ দেবলোক চঢ়্ধহেঁ।
পর্যঁ প্রবাহ কাল কে কদাপি ছুটি হ্যঁ নাহি,
শ্রীব্যাসানন্দ নাম জো প্রতীতি সঁ ন রট্টহেঁ ॥৪॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - যারা শ্রী হরিবংশ নাম থেকে বিমুখ, তারা সর্বদা দুঃখী ও দীন থাকে, যদিও তারা বহুজ্ঞ হয়ে বেদ-পুরাণই পাঠ করুক না কেন। কী লাভ যদি সংসারে তারা দক্ষ বক্তা এবং অনেক শাস্ত্রের পণ্ডিত হিসেবে পরিচিত হন, কারণ তারা জগতকে ভুলিয়ে নিজের প্রতিষ্ঠা বাড়াতে কৃত্রিম কথা তৈরি করেন। কী লাভ যদি হরিবংশ নাম বিমুখ ব্যক্তিরা যজ্ঞাদি কর্ম করেন এবং দান দিয়ে তার ফলে উচ্চ দেবলোকে আরোহণ করেন। সেবক জি দৃঢ়ভাবে বলেন যে, কালের প্রবাহে পড়ে থাকা তুই ততক্ষণ পর্যন্ত তা থেকে মুক্তি পাবি না, যতক্ষণ না শ্রী ব্যাসানন্দনের নাম বিশ্বাসভরে জপ করছিস।

! জয় জয় শ্রীহিত আলভ্য লাভ প্ৰকরণ কি জয় জয় শ্রীহরিবংশ !
১৬. শ্রীহিত মান-সিদ্ধান্ত
বাণী শ্রীহরিবংশ কি, শুনহু রসিক চিত লায়।
যেহি বিধি হয়অ অবলনৌ, সোব সব কহৌ সমুজায় ॥১॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - সেবক জি বলছেন যে হে রসিকজন! মান সম্পর্কিত শ্রী হরিবংশের বাণী চিত্ত দিয়ে শুনুন। শ্রী প্রিয়া জুর মান বা মান-অভিমান কেন এবং কীভাবে হলো, তা আমি বুঝিয়ে বলছি।

শ্রীহরিবংশ জু কথি কহি, সোরু শুনাউঁ গাই।
বাণী শ্রীহরিবংশ কি, নিত মন রহি সমাই ॥২॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - শ্রী হরিবংশচন্দ্র জু নিজের বাণীতে এই সম্পর্কে যা কিছু বলেছেন, আমি তা-ই আপনাদের গেয়ে শোনাচ্ছি। কারণ আমার মন তো শ্রী হরিবংশ-বাণীতে স্থায়ীভাবে মিশে আছে।

শ্রীহরিবংশ অবলনৌ, প্রগট প্রেম-রস সার।
আপনি বুদ্ধি ন কছু কহৌ, সোব বাণী উচ্চার ॥৩॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - শ্রী হরিবংশ জু বর্ণিত মান হলো প্রেমরসের প্রকট সার অর্থাৎ মান লীলা প্রেমরসের সম্পূর্ণ লীলাসমূহের মধ্যে সারভূত লীলা। আমি এর বর্ণনায় নিজের বুদ্ধির বিন্দুমাত্র প্রয়োগ করছি না এবং শ্রী হরিবংশ-বাণীরই আধার গ্রহণ করছি।

শ্রীহরিবংশ জু ক্রীড়হিং, দম্পতি রস সমতূল।
সহজ সমীপ অবলনৌ, করত জু আনন্দ মূল ॥৪॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - শ্রী হরিবংশ স্বরূপ শ্রী শ্যামাশ্যামের পরস্পর ক্রীড়ায় সমান রসের অভিব্যক্তি ঘটে, কারণ উভয়ের (শ্রী শ্যামাশ্যাম) সংযোগ সহজ ও নিত্য। এই নিত্য সংযোগে 'মান' বা মান-অভিমান হলো আনন্দের মূল।

কাহে কৌঁ ডারত ভামিনী, হৌ জু কহত এক বাত।
ন্যানক বদান সন্মুখ করৌ, ছিন ছিন কল্প শিরাত ॥৫॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - হে ভামিনী! (কোপবতী) আমি তোমাকে নিজের একটি কথা বলছি, তা কেন মানছ না? তুমি নিচু করা ঘাড় তুক উঁচু করে তোমার প্রিয়তমের দিকে তো তাকাও! তোমার এই অহেতুক মানের কারণে তাঁর ব্যাকুলতা এতটাই বেড়ে গিয়েছে যে, তাঁর কাছে এক একটি ক্ষণ কল্পের সমান অতিবাহিত হচ্ছে অর্থাৎ তিনি প্রতিটি মুহূর্তে এক কল্পের বেদনা অনুভব করছেন।

বে চিতবত তুব বদন-বিদু, তু নিজ চরণ নিহারত।
বে মৃদু চিবুক প্রলোভহী, তু কর সঁ কর টারত ॥৬॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - ভেবে দেখো তো, প্রিয়তম তোমার মুখচন্দ্রের দিকে তাকিয়ে আছেন আর তুমি তোমার চরণের দিকে তাকিয়ে আছো! তিনি তোমার কোমল চিবুক স্পর্শ করছেন আর তুমি হাত দিয়ে তাঁর হাত সরিয়ে দিচ্ছ।

বচন অধীন সাদা রহৈ, রূপ সমুদ্র আগাধ।
প্রাণরবন সঁ কত করত, বিনু আগস অপরাধ ॥৭॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - রূপ-সৌন্দর্যের অগাধ সাগর তোমার প্রিয়তম সর্বদা তোমার আজ্ঞার অধীনে থাকেন। নিজের প্রাণে রমণকারী এমন নিরপরাধ প্রিয়তমকে কষ্ট দিয়ে তুমি কেন অপরাধ করছ?

চিতয়ৌ কৃপা করি ভামিনী, লীনে কণ্ঠ লাগাই।
সুখ-সাগর পূরিত ভয়, দেখত হিয়ৌ সিরাই ॥৮॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - ভামিনী শ্রী প্রিয়া জু কৃপা করে নিজের প্রিয়তমের দিকে প্রসন্ন দৃষ্টিতে তাকালেন এবং তাঁকে আলিঙ্গন করলেন। এইভাবে দুই সুখ-সাগরের পরস্পর মিলনে উভয়ই সুখে আপ্লুত হলেন অর্থাৎ পূর্ণরূপে ভরে উঠলেন এবং তাঁদের দেখে শ্রী হিত সজনী জুর হৃদয় শীতল হলো।

সেবক শরণ সদা রহৈ, অনন্ত নাহি বিশ্রাম।
বাণী শ্রী হরিবংশ কী, কাই হরিবংশহি নাম ॥৯॥

Bengali Translation/ Explanation: ব্যাখ্যা - সেবক জি বলছেন যে আমি শ্রী হরিবংশের বাণী এবং তাঁর নামের শরণে সর্বদা থেকেছি এবং আমি অন্য কোথাও বিশ্রাম (পরম শান্তি) খুঁজে পাই না।

! জয় জয় শ্রীহিত মান-সিদ্ধান্ত প্রকরণ কী জয় জয় শ্রীহিত হরিবংশ !
॥ জয় জয় শ্রী দামোদর দাস (সেবক জী) কৃত শ্রী সেবক বাণী জু কী জয় জয় শ্রীহিত হরিবংশ ॥

শ্রী সেবক বাণী-ফল স্তুতি

জয়তি-জয়তি হরিবংশ নাম রতি সেবক বানী।
পরম প্রীতি রস রীতি রহসি কলি প্রগত বখানী ॥
প্রেম সংপতী ধাম সুখদ বিশ্ৰাম ধরম্মিন ।
ভনত - গুনত গুন গূঢ় ভক্তি ভ্ৰম ভজত করম্মিন ॥
শ্রীবিআসনন্দ অরবিন্দ চরণ মদ, তাসু রংগ-রস রাচহীং ।
শ্রীকৃষ্ণদাস' হিত হেত সৌং, জে সেবক বাণী বাঁচহীং ॥1॥

কৈ হরিবংশহি নাম ধাম বৃন্দাবন বস গতি ।
বাণী শ্রীহরিবংশ সার সংচ্যো সেবক মতি ॥
পঠন শ্রবণ জো করৈ প্রীতি সোং সেবক বানী ।
ভব নিধি দুস্তর যদপি হোয় তিহিং গোপদ-পানী ॥
শ্রীবিআসনন্দ পরসাদ লহি, যুগল রহস দরসৈ জু উর ।
ভনি বৃন্দাবন হিত রূপ বলি, সুখ বিলসৈং ভাবুক ধাম ধুর ॥2॥

গ্রন্থ সিন্ধু তেঁ সোধি রঙ কলি মাহিঁ বঢ়ায়ৌ ।
ইহ হিত কৃপা প্রসাদ অমী ভাজন ভরি পায়ৌ ॥
রসিক মনৌঁ সুর সভা আনি তিনকৌঁ দরসায়ৌ ।
শ্রীসেবক নিজু গিরা মোহিনী বাঁট পিবায়ৌ ॥
পঠন শ্রবণ নিশি দিন করৈ, দম্পতি সু ধাম সুখ লহৈ অলি ।
বাণী স্বরূপ হরিবংশ তন, ভনি বৃন্দাবন হিত রূপ বলি ॥3॥

সকল প্রপঞ্চ বিনাশ হোত পড় সেবক বাণী ।
শ্রীবৃন্দাবন বাস হোত পড় সেবক বাণী ॥
ব্যাসনন্দ পদ প্রীতি হোত পড় সেবক বাণী ।
শ্রীরাধাবল্লভ মীত হোত পড় সেবক বাণী ॥
পড়িয়ে নিত হিত রঙ সোঁ, সেবক বাণী প্রেম ভর ।
সেবক বাণী কী কৃপা, সেবক বাণী কহৈ সু কর ॥4॥

সেবক সেবক বাণী বোলৌ ।
রূপ রঙ রস মদ মেঁ ছাকে কুঞ্জন-কুঞ্জন ডোলৌ ॥
জাকে পড়ে শুনে অরু গায়ে উপজত প্রেম অমোলৌ ।
রসিক মুকুন্দ সুমির হিত চিত মেঁ কপট কপাটন খোলৌ ॥5॥

বন্দিয় সেবক মুখ কী বাণী ।
শ্রীহরিবংশ নাম কী প্রভুতা জিন বহু ভাঁতি বখানী ॥
অনুভব জনিত রচী ছন্দন দম্পতি-রতি-সদন কহানী ।
রসিকন শ্রবণ সুধা অঁচবাই কো ঐসৌ বड़দানী ॥
ভক্ত-ভূপ হিতপথ জু উজাগর দাইক মান অমানী।
আসয় গহর উদধি হূঁতেঁ অতি জিন জানী তিন জানী ॥
যহাঁ রস-রতন ভয়ে উৎপাতি কহুঁ শুনে ন লঘু নদপানী ।
রসিক জৌহরিনু পরখে কিমত করত বুদ্ধি বৌরানী ॥
হিতদত বিভৌ কোস অধিকারী শ্রীসেবক অগবানী ।
কৃপা বিনা কহি কাহি ফুরৈ অস উক্তি- যুক্তি রসসানী ॥
সব ধর্মন কৌ ধর্ম সিখা মণি তহাঁ বুদ্ধি ঠহরানী ।
শ্রীহরিবংশ হিয়ে কী হিলগন যেতে রহী ন ছানী ॥
জয়তি প্রথম পদ পূজন সর্বোপরি শ্রীরাধা রানী ।
ব্যাসানন্দ বিনু কৌন চিতাবৈ কানন সুখন নিশানী ॥
মুরলিধর অর্ধাঙ্গী পদ্ধতি আগম নিগম বখানী ।
বৃন্দাবন হিত রূপ অনন্য ধর্ম কী ধ্বজ ফহরানী ॥6॥

মন ক্রম - বচন ত্রিশুদ্ধ ন কোঊ, সেবক সোঁ হরিবংশ উপাসক ।
আন ধরম্মিন সংগ নহীঁ, হরিবংশ ধরম্মিন সোঁ বিসবাসক ॥
হরিবংশ পতিব্রত লৈ নিবহ্যৌ, দুখ পাই খিস্যাই রহে উপহাসক ।
হরিবংশ কৃপা রসমত্ত সদা, সোঈ ‘নাথ’ কহৈঁ অব যামেঁ কহা সক ॥7॥

শ্রী সেবক বাণী জু যহ অতি অগাধ মত গূঢ় ।
বিরলো কোঊ সমুঝঈ হিত মারগ আরূঢ় ॥
হিত মারগ আরূঢ় ভাব ভাগৌত মিলৈ সব।
চার বেদ সুস্মৃতি জু চার অবগাহি লেহি জব ॥
তব পাৱৈ সেবক হৃদৈ, জু হিত মারগ উপদেশিয় ।
হিতবল্লভ গুরু কৃপা বল, জো সমুঝে কোঊ ধীর ধিয় ॥8॥

! জয় জয় শ্রী সেবক বাণী ফল স্তুতি কী জয় জয় শ্রীহিত হরিবংশ !

॥ শ্রী ললিতা জূ কী জয় ॥
॥ শ্রী বিশাখা জূ কী জয় ॥
॥ শ্রী চম্পকলতা জূ কী জয় ॥
॥ শ্রী চিত্রা জূ কী জয় ॥
॥ শ্রী তুঙ্গবিদ্যা জূ কী জয় ॥
॥ শ্রী ইন্দুলেখা জূ কী জয় ॥
॥ শ্রী রঙদেবী জূ কী জয় ॥
॥ শ্রী সুদেবী জূ কী জয় ॥
॥ সমস্ত সহচরী বৃন্দ কী জয় ॥